print news || Dailydeshsomoy

 

লেখার শুরুতে একটি ঘটনার বর্ণনা না দিলেই নয়। বেশীদিন আগের কথা নয়। নিউ ইয়র্কের একটি বিশাল স্টেজে একজন মহিলা গান গাইতে শুরু করলেন। এমন অপরিচিত পুরুষ কিংবা মহিলাদের প্রায়ই স্টেজে দেখা যায়। কেউ গান গাওয়ার চেষ্টা করেন কিংবা কেউ কবিতা আবৃতি করেন। এসব বিষয় নিয়ে দর্শকদের মধ্যে কোন আগ্রহ থাকে না। দর্শক নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। কেউ শুনছে না অথচ শিল্পী গান পরিবেশন করেই যাচ্ছেন। আর এসব শিল্পীরা মূলত বড় স্পন্সরের স্ত্রী কিংবা সন্তান হয়ে থাকে। সেদিন সেই স্টেজ থেকে হঠাৎ শিল্পীর পিছনের মিউজিশিয়ানরা সকলেই আর না পেরে বের হয়ে গেলেন। মহিলা এতোই জঘন্য গান পরিবেশন করছিলেন যে মিউজিশিয়ান সবাই তার সাথে বাদ্য যন্ত্র বাজাতেও অপমান বোধ করছিলেন। পরে জানা যায় ভদ্র মহিলা একজন স্পন্সরের সহধর্মিনী। এমন ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্যিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। পোস্টারে শুধু মানুষের ছবি আর নাম। বিষয়টি বাদ যাবে না একটি শিশু পোলিও খাওয়া থেকে’র মতোই।

হিরো আলম তার বেসুরা গলায় রবীন্দ্র সংগীত গাওয়ার ফলে রবীন্দ্রনাথ প্রেমীরা সোচ্চার হন এবং তাকে এধরনের কার্যকলাপ না করতে বাধ্য করেন। যদিও প্রশাসনের পদক্ষেপ সমালচনার মুখে পরে।

অন্যান্য সাংগঠনিক অনুষ্ঠানে এসব মেনে নিলেও বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তা মোটেও কাম্য নয়। কিন্তু হয়েছে তাই। প্রচারের জন্য যে পোস্টার করা হয়েছে তাতে নজরুল নয় বরং আয়োজকদের কে বেশী প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। অনেকটা নির্বাচনী পোস্টার দিয়ে নজরুল সম্মেলনের প্রচার চালানো হয় যা সম্মেলনের গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে।বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের জাতীয় কবিকে পৌঁছে দেয়ার কথা বলে যারা সম্মেলনের আয়োজন করেছেন তারা ইংরেজিতে নজরুলের নামটিই সঠিকভাবে লেখেননি। সম্মেলন উপলক্ষে প্রকাশিত সংকলনে নজরুলের নাম লেখা হয়েছে NAZARUL.

১৩ আগস্ট শনিবার শুরু হয়ে ১৪ আগস্ট রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সিতে সম্মেলন শেষ হয়েছে গুটিকয়েক আয়োজক এবং অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতিতে। একটি ব্যর্থ সম্মেলন শেষও হয়েছে বিরক্তির মধ্য দিয়ে। পোস্টারে যত লোকের নাম আর ছবি ছিল তাদের সকলের পরিবারের দুজন করে আসলেও হল ভর্তি দর্শক থাকতে পারতো। কিন্তু তা হয়নি।

শতদল নামের একটি অপরিচিত এবং পারিবারিক সংগঠনের আয়োজনে বসেছিল এবারের নজরুল সম্মেলন। সহজ যাতায়াতের উপায় নেই এবং নগরকেন্দ্র থেকে দূরে ছিল এ আয়োজন। ধারনা করা হয় শুধু মাত্র আয়োজকদের বাড়ির কাছে চিন্তা করেই ভেন্যু নির্ধারণ করা হয়েছে, দর্শক কিভাবে যাবে সেটা মূখ্য নয়। ব্যাপক কোনো প্রচারণাও করা হয়নি। সম্মেলনে যোগ দিতে চেয়েছেন তাদের জন্য কোনো গণপরিবহন সুবিধা ছিল না। ফলে নিজেদের গাড়ি আছে এমন লোকজনই সম্মেলনে উপস্থিত হওয়া সম্ভব ছিল। শাড়ি, চুড়ি ও খাবারের দোকানের ব্যবসায়ী, বিভিন্ন গ্রুপের অংশগ্রহণকারী শিশু-কিশোর ও তাদের অভিভাবক ছাড়া জনসমাজের কোনো উপস্থিতি ছিল না দু’দিনের নজরুল সম্মেলনে।

সম্মেলন উপলক্ষে শতদল এক স্মরণিকা বের করেছে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রবন্ধ রয়েছে এ সংকলনে। সংকলনটি হয়ত দূরদেশে জাতীয় কবির স্মারক হিসেবে সংগ্রহে রাখতে চাইবেন কেউ কেউ। কিন্ত অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার হলো প্রথম পাতাতেই এর বানান বিভ্রাট। তাও কিনা আমাদের জাতীয় কবি, প্রাণের কবির নামের বানান! ইংরেজী বানান ওনারা লিখেছেন Nazarul.

যে মহান কবিকে নিয়ে দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন, তাঁর নামের ভুল বানান অনেককে ক্ষুব্ধ করেছে। এজন্য আয়োজকদের পক্ষ থেকে কোনো দুঃখ প্রকাশও করতে দেখা যায়নি। সম্মেলনে সেমিনারের আয়োজন ছিল। এসব সেমিনারে দেশ-বিদেশের নজরুল গবেষকদেরও উপস্থিতিছিল। ব্যবস্থাপনার অভাব এবং অনুষ্ঠান সাজানোর অনভিজ্ঞতার কারণে সেমিনারগুলোতে আলোচকদের বাইরে দশজনের কম দর্শক উপস্থিত ছিলেন। আয়োজক কমিটিতে যতো লোক দেখা গেছে তাদেরও সকলের উপস্থিতি চোখে পরেনি। দর্শক সারীতে লোক না থাকলেও স্টেজ ছিলো ভরপুর।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাতনি খিলখিল কাজীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে আনা হলেও তাঁকে মঞ্চে সময় দেয়া হয়নি। শেষদিনের অনুষ্ঠানে তিনি খেদোক্তি করে বলেছেন, সব্যসাচী পুরস্কার ঘোষণার সময়েও তাঁর বাবা কাজী সব্যসাচীকে স্মরণ করা হয়নি।

নগরকেন্দ্র থেকে দূরে ছিল সম্মেলনকেন্দ্র। আশপাশে দোকানপাট নেই, জনমানবহীন এলাকা। আমন্ত্রিত অথিতিদের জন্য খাবারের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। নিউইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া থেকে ক্ষুদে শিল্পী ও তাদের অভিভাবকদের খাবারের জন্য হন্যে হয়ে এদিক- ওদিক ছুটতে দেখা গেছে। সংবাদ সংগ্রহে উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যরাতের পর খাবারের জন্য মাইলের পর মাইল খোঁজ নিতে হয়েছে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে এ নিয়ে কোনো আগাম ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

ড. লীনা তাপসী, ওস্তাদ সালাউদ্দিন আহমেদ, সুজিত মোস্তফাকে মঞ্চে সময় দেয়া হয়নি। নিউইয়র্কে বিপাসহ স্থানীয় সংগঠন ও সাংস্কৃতিক দলের পারফর্মেন্স মনকাড়া হলেও এসব শিল্পীর সাথে আসা পরিবার-পরিজন ছাড়াদর্শক-শ্রোতাহীন মিলনায়তনে তাদের পারফর্ম করতেহয়েছে। সবচেয়ে বিরক্তিকর ছিল অনুষ্ঠানের শেষপর্বে রোববার রাত দশটায় সবাইকে আটকে রেখে আয়োজকদের একজন নিজের আবৃত্তি শোনানোর প্রয়াসটি। তাকেই অযাচিতভাবে বারবার মঞ্চে দেখা গেছে বিরক্তিকর কথাবার্তা নিয়ে উপস্থিত হতে।

উত্তর আমেরিকা নজরুল সম্মেলনের পৃষ্ঠপোষকতায় অনেকেই এগিয়ে এসেছিলেন। এ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে অর্থ সংগ্রহ কম হয়নি। আয়জকদের কেউ কেউ জানান, সম্মেলন শেষ হলেই হিসেব-নিকেশ চাওয়া হবে কড়াকড়িকরে। স্বচ্ছতার জন্যই এ কাজটি করা হবে বলে জানানো হয়েছে। একজন নজরুল অনুরাগী এ সম্মেলনকে ব্যর্থ বলে উল্লেখ করলেও আয়োজকদের মধ্যে কারও জন্য সম্মেলনটি ব্যাপক সাফল্যের হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।আয়োজকদের একজন ছাফাই গেয়ে বলেন- আয়োজনের সফলতা দর্শক উপস্থিতির উপর নির্ভর করে না বরং এতো বড় আয়োজন করাটাই সফলতা।
প্রথম আলো নিউয়র্কের সম্পাদক ইব্রাহিম চৌধুরি তার ফেসবুক পেজে বলেন-নানা তামাশা হলেও সম্মেলনটি কারো কারো জন্য ব্যাপকভাবে সাফল্যের বলা যায়। দর্শক না থাকলেও অনেকে মঞ্চে জায়গা দেয়া গেছে। নগরকেন্দ্রে বাইরে, গনপরিবহনের কোন সংযোগ ছাড়া ভ্যানু। শিল্পী কুশলীদের ড্রাইভ করে নিয়ে আসা লোকজন একান্তে দেখতে পেরেছেন। আশেপাশে কোন দোকানপাট না থাকায় খিদে পেয়েছে। একদিন দুইদিন খিদের জ্বালায় ছটফট করলেও এমন নিরালা ভ্যানুর নির্জন করিডোরে দাঁড়িয়ে জাতীয় কবির দর্শন নিয়ে ভাবার অবকাশ মিলেছে।
ব্যবসাবুদ্ধির কারনে একটাই খাবারের স্টল। দুই একদিন আগের খাবার থাকলেও পাওয়াতো গেছে। ব্যবসায়ী আপাটি বলছিলেন, মেলায় এসেছেন- এক বাটি মুড়িচানাচুর ৬ ডলার দেবেন না কেন? একজন আবার প্রতি ডলার ১২০ টাকা হয়ে গেছে বলে জানালেন। ডলারের মূল্য বাড়া আমেরিকায় থাকা লোকজনের জন্য কোন দুঃসংবাদ নয়। দুঃসংবাদ অন্যত্র ! নজরুল সম্মেলনে এ নিয়ে না ভাবলেও চলবে।
নজরুলের নামের বানানটিও ভুল ইংরেজিতে লখা হলেও কেউ কিছু বলেননি। সহিষ্ণুতা এবং অন্যের প্রয়াসের প্রতি স্বদেশীদের ক্ষমাসুন্দর মনটাই অগ্রাধিকার পেয়েছে।
কবি পরিবারের খিলখিল কাজী খেদোক্তি করলেও, লীনা তাপসী বা ওস্তাদ সালাউদ্দিনকে মঞ্চে সময় না দেয়া হলেও, আয়োজকরা পদক দিয়েছেন স্পন্সরদের বেশ বিনয় করে। এমন বিনয় আমাদের জন্য খুবই জরুরী।
আর হ্যাঁ, সবকিছুতে বিরক্ত হলেও , আয়জক সংগঠকের বারবার মঞ্চে কথা বলা আর সবাইকে আটকে রেখে অনুষ্টান শেষ করার সময়ে তাঁর আবৃত্তির রেশ নিয়ে যারা ঘরে ফিরলেন, সবই তাদের বাড়তি পাওনা !
আবার নিউ ইয়র্কের পরিচিত মুখ নাসির খান পল বলেন- আমিত্য আমিত্য করলে কোন অনুষ্ঠান সফল হয় না। তার অনেক প্রমান আমরা অনেক দেখেছি। দর্শকদের কাছে টেনে নিতে সবাই পারে না। সব সহ্য করা যায় কিন্তু নজরুলের বানান ভুল অমার্জিনিও।
দর্শক হোক না হোক আমিতো সখ মিটিয়েছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন টিপ্পনি কেটে বলেন- নিজে আহবায়ক, স্ত্রী ট্রেজারার, মেয়ে পারফর্মার আর ছেলে দর্শক, আয়োজন সফল।
আহবায়কের নাম উল্লেখ করে তার এক সহপাঠী বলেন- ও কবে নজরুল প্রেমী হলো? ও না কবি, না গায়ক, না লেখক, না নজরুল গবেষক না কোন সংগঠক। সে কিভাবে নজরুল সম্মেলনের আহবায়ক হয়?
তার আরও এক সহপাঠী বলেন- চার বছর আগের ১৮তম নজরুল সম্মেলনে মারামারি করেছে এবার কি করবে কে জানে!