
প্রকাশিত, ০৭-১২-২০২০
বায়েজীদ (গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি) :
মোড়ে মোড়ে দীর্ঘ যানজটে থেমে থেমে চলছে যানবাহন। যতটুকু পথে গাড়ীর চাকা ঘোরে- সেটাও আবার লাফিয়ে লাফিয়ে। আধাঘন্টা পেড়িয়ে গেলেও শেষ হয়না দশ মিনিটের পথ। অফিস-আদালত কিংবা হাসপাতালের পথে বিড়ম্বনার শেষ নেই পথচারীদের। রাজধানী কিংবা ব্যস্ততম কোনো নগরী নয়, এই চিত্র মফস্বল শহর গাইবান্ধার।
শহরজুড়ে পৌরবাসী ও পথচারীদের দূর্দশার জন্য শহরের ডিবি রোডে চলমান ফোরলেন প্রকল্পসহ পৌর এলাকার পাড়ায় পাড়ায় চলমান রাস্তা ও ড্রেনের উন্নয়নমুলক কাজের ধীরগতিকে দায়ী করছেন অনেক। প্রায় দু’বছর ধরে চলছে শহরের ফোরলেন প্রকল্পের কাজ।
গাইবান্ধা সড়ক বিভাগ জানায়, আড়াই কিলোমিটার ফোর লেনের মধ্যে দুই বছরে শেষ করা সম্ভব হয়েছে আধা কিলোমিটার সড়কের কাজ। এক কিলোমিটারে অধিগ্রহন করা ভুমি থেকে উচ্ছেদ কার্যক্রম শেষ হয়েছে সম্প্রতি। ফলে নির্মাণ কাজে এখনো হাত দিতে পারেনি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। বাকী এক কিলোমিটার রাস্তার কাজে অন্তরায় হয়ে আছে ভুমির মালিকানা দাবিকারীদের করা মামলাজনিত কারনে। জমির মালিকানা নিয়ে ঝুলে থাকা একটি মামলা শেষ না হতেই উচ্চ আদালতে আরো ষোলটি রিট হয়েছে । আদালতের আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত ওই এক কিলোমিটার অংশে কাজ শুরু করার কোন সম্ভাবনাই দেখছে না সড়ক বিভাগ। সবমিলিয়ে নানা জটিলতার কবলে প্রতিক্ষিত ফোরলেন যেন শহরবাসীর গলার কাটা হয়ে দাড়িয়েছে। অল্প কিছু সময় শহরে অবস্থান করলেই দেখা যায় পথচারীদের দূর্ভোগ-দুর্দশা আর ভোগান্তি।
সোমবার (০৭ ডিসেম্বর) ঘড়ির কাটায় সময় তখন বেলা ১১টা। শহরের পুরাতন বাজার থেকে রিক্সায় যাত্রা ডিসি অফিসের উদ্দেশ্যে। রিক্সায় ওঠার পর থেকেই লাফিয়ে লাফিয়ে চলছিল রিক্সার চাকা। খানাখন্দে ভরা ডিবি রোডের প্রায় পুরো রাস্তাজুড়ে কার্পেটিং উঠে ছোট বড় অসংখ্য গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কাচারী বাজার, রেলগেট এলাকায় ড্রেনের জন্য গর্ত করা হয়েছে। ফলে রাস্তা সংকোচিত হয়ে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। ডিবি রোড ধরে হকার্স মার্কেট, বাসটার্মিনাল পার হয়ে ডিসি অফিস পর্যন্ত রিকশা ধরে যেতে দশ মিনিটের পথে সময় লেগে যায় ২৭ মিনিট।
পথচারী সোনিয়া পারভীন আক্ষেপ করে বললেন, রাস্তা দিয়ে হাঁটা অসহনীয় এবং ঝুকিপুর্ন। একদিকে যানজটের দুর্ভোগ, অন্যদিকে ধুলোবালিতে পথ চলা দায় এছাড়া নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে যানবাহনগুলো চলছে খেয়াল খুশি মতন। ফলে হাটাচলা হয়ে উঠছে ঝুকিপুর্ন। ভ্যানচালক মেলন বলেন, ভাঙাচোরা সড়কের জন্য প্রয়োজনীয় মালামাল নেওয়া সম্ভব হয় না। তাছাড়া অতিরিক্ত ঝাকুনিতে ভ্যানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে কষ্ট করেই ভাঙাচোরা রাস্তায় চলাচল করতে হচ্ছে। যানজট নিরসন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে গাইবান্ধাবাসীর স্বপ্ন ছিল ফোরলেন। কাজ শুরুর পর সবাই বেশ উচ্ছসিত ছিলো। কিন্তু উদ্বোধনের পর প্রায় দুই বছর হলেও তেমন অগ্রগতি নেই। ফলে স্বপ্নের ফোরলেন এখন মানুষের চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।
দ্রুত কাজ শেষ করতে না পারলে চীনের দুঃখ হোয়াংহোর মতো চার লেন সড়ক নির্মাণ গাইবান্ধাবাসীর দুঃখে পরিণত হবে- বলছিলেন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) জেলা সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য মিহির ঘোষ।
২০১৮ সালের ৮ নবেম্বর শহরে আড়াই কিলোমিটার ফোরলেন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও গাইবান্ধা সদর আসনের সংসদ সদস্য মাহাবুব আরা বেগম গিনি। এ পর্যন্ত পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে বাসটার্মিনাল পর্যন্ত মাত্র আধা কিলোমিটার সড়কের কাজ সমাপ্ত হয়েছে। রেলগেট থেকে পুরাতন বাজার পর্যন্ত এক কিলোমিটার এলাকায় স্থাপনা, বৈদ্যুতিক খুটিসহ বিভিন্ন সেবা সংস্থার সংযোগ লাইন উচ্ছেদ করা হয়েছে- তবে এখনো নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। আড়াইকিলোমিটার ফোরলেনের মধ্যে বাকি এক কিলোমিটার বাস টার্মিনাল থেকে রেলগেট পর্যনত ফোরলেনের কাজ ঝুলে আছে ভূমির মালিকানা সংক্রান্ত মামলা জটিলতায়।
গাইবান্ধা সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান বলেন, ২০০২ সালে গাইবান্ধা শহরের বাস টার্মিনাল থেকে রেলগেট পর্যনত সড়কের উভয় পাশে জমির মালিকানা দাবী করে পলাশপাড়ার আব্দুর রশিদ, সাখাওয়াত, রাজ্জাকসহ কয়েকজন আদালতে মামলা করে একতরফা নিষেধাঙ্গার রায় পান। অথচ ১৯৬৫-৬৬ সালে ভূমি অধিগ্রহণ করেই সড়ক নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে ওই রায়ের প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালে আদালতে আরেকটি মামলা করা হলে সেটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান আছে। কিন্তু আবারো একই জমির মালিকানা দাবী করে উচ্চ আদালতে ১৬টি রিট পিটিশন দায়ের করেন ওই এলাকার বাসিন্দারা। তোফাজ্জল হক চৌধুরী, মুনজুরুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম, শেরিনা বানু, আফছার আলী সরকার, মমিনুল ইসলাম মন্ডল, রওশন আকতার, সোহরা বানু, এ.টি.এম রফিকুল ইসলাম, শালিনা খাতুন। এ প্রসঙ্গে নাগরিক নেতা আলমগীর কবীর বাদল বলেন,ন্যায্য অধিকার আদায়ে আইনের আশ্রয় নেবার অধিকার সকলেরই রয়েছে। তবে এটা দু:খজনক যে, এলাকার মানুষের সঠিক পদক্ষেপ গ্রহন না করবার দরুনই এমন একটি উন্নয়নমুলক কাজের সুফল পেতে আমরা এলাকার মানুষই বাধা হয়ে দাড়িয়েছি।
সময় ক্ষেপনের দরুন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারও কাজের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। কারন সড়ক নির্মান কাজের উপকরনের মুল্য সময়ের সাথে ওঠানামা করে। ফলে কিছু কিছু উপকরন ক্রয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়তে চাননা। সেসাথে দীর্ঘসুত্রিতায় ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়।
এই বিষয়গুলো সম্পর্কে পরিস্কার ধারনা নেই এলাকাবাসীর। ফলে ঝিমিয়ে পড়া ফোরলেনের কাজ নিয়ে ক্ষোভসহ নানা ধরনের মন্তব্য রয়েছে জনমনে।
তবে এত সব কিছুর পরও সব অন্তরায় কাটিয়ে উঠে দ্রুত সম্পন্ন হবে ফোরলেন প্রকল্পের কাজ, এমনটাই প্রত্যাশা গাইবান্ধাবাসীর।


