
প্রকাশিত
নিজস্ব প্রতিবেদক:
এইচএসসি পরীক্ষার চাপ, জিপিএ-৫ পাওয়ার স্বপ্ন আর সেনা কর্মকর্তা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা—সবই ছিল মিনহাজুল ইসলাম রোজানের।
আজ ২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিন। অথচ যে দিনে পরিবারে থাকার কথা ছিল আনন্দের আয়োজন, সেই দিনটিই এখন মা-বাবার কাছে কেবলই শোক আর স্মৃতির।
মিনহাজুল ইসলাম রোজান ছিলেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থী। চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। পরীক্ষার আগে জিপিএ-৫ পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে নিজের মধ্যেই এক ধরনের চাপ তৈরি করেছিলেন রোজান।
মা ফাহমিদা আক্তারকে প্রায়ই বলতেন, ‘যদি জিপিএ-৫ না পাই?’ মা তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন, ‘না পেলে কিছু হবে না।’ কিন্তু রোজান মায়ের কথায় সন্তুষ্ট হতেন না। বলতেন, ‘মা, তুমি কিছু বুঝতেই পারছো না, জিপিএ-৫ না পেলে ভালো জায়গায় ভর্তি হওয়া যাবে না।’
এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া রোজান অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পালন করেছেন। বিএনসিসি অ্যাডমিন, প্যারেডের সেন্ট্রাল কমান্ডার, এক্সিকিউটিভ প্যানেল ফটোগ্রাফারসহ নানা কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। স্বপ্ন ছিল সেনা কর্মকর্তা হওয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই থেমে যায় তাঁর জীবন।
গত ৬ আগস্ট অসুস্থ হয়ে পড়েন রোজান। পরিবার তাঁকে একাধিক হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরিবারের ভাষ্য, চিকিৎসকেরা তাঁর শারীরিক অসুস্থতার বদলে পরীক্ষার চাপ, প্যানিক অ্যাটাক কিংবা মানসিক সমস্যার বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দেন। ডায়াবেটিসসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হয়নি বলেও অভিযোগ পরিবারের।
১৩ আগস্ট শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় রোজানের রক্তে শর্করার মাত্রা ৩৮ মিলিমোল/লিটারে পৌঁছে যায়। সেদিনই প্রথম জানতে পারেন তাঁর মা-বাবা—ছেলের আগে থেকেই ডায়াবেটিস ছিল।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৭ আগস্ট তাঁকে অন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের অস্ত্রোপচারও করা হয়। বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার প্রস্তুতিও নিয়েছিল পরিবার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর তাঁকে বাঁচানো যায়নি।
২৩ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মিনহাজুল ইসলাম রোজান। তাঁর এইচএসসি পরীক্ষার ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার কথা ছিল ১৫ আগস্ট। কিন্তু তার আগেই তিনি চলে যান লাইফ সাপোর্টে।
আর আজ সেই রোজানের জন্মদিন। এই দিনটিতে তাঁর মা-বাবার ঘরে নেই কোনো উৎসব। নেই জন্মদিনের কেক, শুভেচ্ছা জানানোর ব্যস্ততা কিংবা ছেলেকে নিয়ে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। আছে শুধু স্মৃতি আর না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস।
রোজানের মা ফাহমিদা আক্তারের আক্ষেপ, ছেলে পড়াশোনায় ভালো ছিল। জিপিএ-৫ পাওয়ার জন্য পরিবার থেকে কোনো চাপ দেওয়া হয়নি। বরং নিজের কাছেই নিজে চ্যালেঞ্জ নিত রোজান।
মায়ের কাছে এখন সবচেয়ে বড় কষ্ট—ছেলের অসুস্থতার বিষয়টি যদি একটু আগে শনাক্ত করা যেত, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি অন্য রকম হতে পারত।
রোজানের বাবা সাজ্জাদুল মিরাজ বলেন, ছেলে সব সময় নিজের পরিচয়ে পরিচিত হতে চেয়েছে। বাবার রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে নিজের একটি পরিচয় গড়ে তুলতে চেয়েছিল। সেনা কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
যে বয়সে পরিবার, বন্ধু আর স্বজনদের সঙ্গে জন্মদিনের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার কথা ছিল, সেই বয়সেই স্মৃতির মানুষ হয়ে গেছেন তিনি।
রোজানের জন্য আজ কোনো জন্মদিনের কেক নেই—আছে পরিবারের চোখের পানি, আর অপূর্ণ থেকে যাওয়া এক তরুণের স্বপ্ন।



