print news || Dailydeshsomoy

প্রকাশিত

সঞ্জিব দাস, গলাচিপা (পটুয়াখালী): প্রতিনিধি

পটুয়াখালীর গলাচিপায় মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি থাকলেও থেমে নেই ইলিশ শিকার ও কেনাবেচা। একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় উপজেলার বিভিন্ন নদ-নদী ও উপকূলীয় এলাকায় প্রকাশ্যে ও গোপনে অবাধে চলছে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান সত্ত্বেও দালাল চক্র ও নির্ধারিত ক্রেতাদের মাধ্যমে অন্ত অন্তত ১০ থেকে ১৫টি গোপন পয়েন্টে ইলিশ বেচাকেনা হচ্ছে।

নাম-পরিচয় নিশ্চিত হয়ে ইলিশের গোপন আস্তানা

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞার সময়ে অপরিচিত কারও কাছে সরাসরি মাছ বিক্রি করা হচ্ছে না। অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলা এড়াতে ক্রেতার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরেই কেবল মাছ সরবরাহের চুক্তি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট স্থানে টাকা জমা রেখে মাছ সংগ্রহের অদ্ভুত নিয়মও চালু করেছে চক্রটি।

চরবিশ্বাস ইউনিয়নের জেলে মো. মন্নানের সঙ্গে ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করা হলে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর দুপুর ২টার দিকে চরআগস্তি বাজারে অপেক্ষা করার শর্তে ইলিশ দেওয়ার আশ্বাস দেন। একই এলাকার জেলে মো. মিজান জানান, এক কেজি ওজনের ইলিশ ১,৫০০ টাকা, ১ কেজির কম ৫০০-৬০০ টাকা এবং ছোট ইলিশ ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে সরাসরি মাছ না দিয়ে চরকাজল এলাকার একটি ওয়ার্কশপে টাকা রেখে এলে চাহিদা অনুযায়ী ইলিশ পৌঁছে দেওয়ার কথা জানান তিনি।

দুর্গম এলাকায় অভিযানে বাধা ও ধাওয়া

মা ইলিশ রক্ষায় পরিচালিত অভিযানেও বাধার সৃষ্টি করছে এই সংঘবদ্ধ চক্র। চরবিশ্বাস ইউনিয়নের দুর্গম নমোর স্লুইস এলাকায় অভিযান চালানোর সময় স্থানীয় একদল প্রভাবশালী জেলে প্রশাসনের ট্রলারকে ধাওয়া করে এবং হামলার চেষ্টা চালায় বলে অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও প্রশাসনিক তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

রাতের আঁধারে বিভিন্ন পয়েন্টে শিকার

পৌর এলাকা-সংলগ্ন রামনাবাদ নদী, চিকনিকান্দির দয়াময়ী মন্দির ও বদনাতলীর তেঁতুলিয়া পয়েন্ট এবং পানপট্টি লঞ্চঘাটের আগুনমুখা মোহনায় রাতের আঁধারে দেদারসে ইলিশ শিকার চলছে। প্রশাসনের টহল ট্রলার দেখলেই জেলেরা পাশের বন বিভাগের সংরক্ষিত বনে আশ্রয় নিয়ে আত্মগোপন করেন।

এছাড়া চরকাজল ইউনিয়নের লঞ্চঘাট, চরশিবা, চরবিশ্বাসের চরআগস্তি, জিমতলা, নমোর স্লুইসগেট, আমড়াগাছিয়া, চরবাংলা; রতনদী তালতলীর বন্যাতলী, পাতাবুনিয়া স্লুইসগেট; সদর ইউনিয়নের চরকারফারমা, বোয়ালিয়া ও পক্ষিয়া স্লুইসগেটসহ বহু স্থানে অবৈধ আহরণ ও বেচাকেনা চলছে।

কথা বলতে ভয় পাচ্ছে স্থানীয়রা

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস কারও নেই। এমনকি মাছ ধরতে যাওয়ার সময় বা বিক্রির জায়গায় নৌকায় মুঠোফোন বহন না করার ওপরও চক্রের কড়া বিধিনিষেধ রয়েছে।

মৎস্য বিভাগের বক্তব্য ও উদ্ধার অভিযান

গলাচিপা উপজেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ দিনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ২৮৫ মেট্রিক টন ইলিশ ও বিপুল পরিমাণ জাল জব্দ করা হয়েছে। মোট ১২টি মামলায় ৬ জন জেলেকে সাজা দেওয়ার পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

এ বিষয়ে গলাচিপা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন জানান, “মৎস্য বিভাগসহ বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়ে দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে প্রতিদিন একাধিক যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে।” নমোর স্লুইস এলাকায় অভিযানে বাধার বিষয়ে তিনি বলেন, “অঞ্চলটি অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় সংঘবদ্ধ একটি চক্র ডাক-চিৎকার করে হামলার চেষ্টা করেছিল, তবে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।”