
প্রকাশিত।
সঞ্জিব দাস, গলাচিপা, পটুয়াখালী, প্রতিনিধি
একটি মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম কতটা হৃদয় বিদারক ও অবর্ণনীয় হতে পারে, তার এক করুণ উদাহরণ পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার অসহায় মাহেব চৌকিদার (৫৫).
মরণব্যাধি স্কিন ক্যান্সারে জীবন যখন নিভে যাওয়ার উপক্রম, তখন প্রাণ বাঁচানোর শেষ অবলম্বন হিসেবে গত ২৭ আগস্ট অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কেটে ফেলতে হয়েছে তার শরীরের অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘পুরুষাঙ্গ’। মারাত্মক অঙ্গহানি, তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা আর চরম আর্থিক শূন্যতায় আজ এই মানুষটির আকুল চাপা কান্না বাতাসকে ভারী করে তুলছে। সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব এই রিকশাচালকের একটাই আর্তনাদ—”আমি বাঁচতে চাই, আমায় একটু সাহায্য করুন।”
বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার মৃত কালাই চৌকিদারের ছেলে মো. মাহেব চৌকিদারের জীবনের গল্পটি শুরু থেকেই চরম দুঃখ-কষ্টে ভরা। খুব ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারিয়ে এতিম হয়ে যান তিনি। শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দ-উচ্ছ্বাস বা শিক্ষার আলো পাওয়ার আগেই বেঁচে থাকার রূঢ় বাস্তবতায় বড় ভাইয়ের হাত ধরে চলে আসেন পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা পৌর শহরে।
অবুঝ বয়সেই পেটের দায়ে তাকে নামতে হয় কঠোর দৈহিক পরিশ্রমে। কখনো খাবারের হোটেলে থালা-বাসন ধোয়া, আবার কখনো প্রখর রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রিকশা ও ভ্যানের প্যাডেল ঘুরিয়ে কোনোমতে অন্নসংস্থান করতে হয়েছে তাকে।
অভাবের সাথে যুদ্ধ করেই কেটে যায় জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময়।
আজ থেকে প্রায় ৩৫ বছর আগে গলাচিপা উপজেলার সদর ইউনিয়নের দক্ষিন চরখালী গ্রামের মৃত রশিদ সিকদারের একমাত্র মেয়ে রাশিদা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন মাহেব চৌকিদার এবং শ্বশুরবাড়ির গ্রামেই বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে তাদের ঘরে জন্ম নেয় চার কন্যা ও এক পুত্র সন্তান। দিনমজুরের কাজ করে এবং অটোরিকশা চালিয়ে রক্তপানি করা উপার্জনে তিনি তিনটি মেয়ে ও একমাত্র ছেলেকে কষ্টসৃষ্টে বিয়ে দিয়ে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। তার ছোট মেয়েটি বর্তমানে স্থানীয় একটি মাধ্যমিক স্কুলে পড়াশোনা করছে। টানাটানির সংসার হলেও মাহেব চৌকিদারের স্বপ্ন ছিল ছোট মেয়েটিকে পড়াশোনা করিয়ে সুশিক্ষিত করা। কিন্তু তাদের এই অতি সাধারন ও হাসিখুশি সংসারটিতে হঠাৎ নেমে আসে অমাবস্যার ঘোর অন্ধকার। ২০২৪ সালে হঠাৎ মাহেব চৌকিদারের পুরুষাঙ্গে একটি সামান্য ঘা দেখা দেয়। প্রাথমিক অবস্থায় সেটিকে সাধারণ চর্মরোগ মনে করে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা শুরু করলেও দিন দিন তা জটিল হতে থাকে। ভালো হওয়ার আশায় পটুয়াখালী ও বরিশাল সদরের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডাক্তারের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে থাকেন তিনি। দীর্ঘদিনের চিকিৎসায় কোনো সুফল পাওয়া তো দূরের কথা, বরং দিন দিন জমানো সঞ্চয় শেষ হয়ে নিঃস্ব হতে থাকেন তিনি। পরবর্তীতে উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন, তিনি মরণব্যাধি ‘স্কিন ক্যান্সার’-এ আক্রান্ত।
এই দুঃসংবাদ জানার পর পরিবারটির ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। মরণব্যাধির হাত থেকে রোগীকে বাঁচাতে পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসার সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হয়। চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে একপর্যায়ে মাহেব চৌকিদার তার উপার্জনের একমাত্র সম্বল অটোরিকশা এবং গরু, ছাগল বিক্রি করে দেন। আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর কাছ থেকে ধারদেনা করে পুরো পরিবারটি দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু ক্যান্সারের ভয়াবহতা তাতেও কমেনি। অসহ্য যন্ত্রণায় দিনরাত ছটফট করা মাহেব চৌকিদারকে বাঁচাতে চিকিৎসকরা জানান, তার পুরুষাঙ্গ সম্পূর্ণ কেটে ফেলা ছাড়া জীবন রক্ষার আর কোনো উপায় নেই।
অবশেষে বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা হিসেবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলে দেওয়া হয়। একজন পূর্ণাঙ্গ পুরুষের জন্য এই শারীরিক ক্ষত ও মানসিকভাবে নিজেকে মেনে নেওয়ার যন্ত্রণার গভীরতা কতটা কঠিন, তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।
অঙ্গ হারিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেও তার জীবনসংগ্রাম কিন্তু শেষ হয়নি। ক্যান্সার রোগটি পুরোপুরি নির্মূল করতে বর্তমানে প্রয়োজন ব্যয়বহুল কেমোথেরাপিসহ নিয়মিত নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র। কিন্তু বর্তমানে এই চিকিৎসা চালানো তো দূরের কথা, ঘরে দুবেলা খাবার জোটানোই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি আজ শারীরিক যন্ত্রণা আর চরম দারিদ্র্যে বিছানায় শয্যাশায়ী।
একদিকে নিজের চিকিৎসার খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে ঘরে চরম অভাব ও অর্থাভাবে ছোট মেয়েটির পড়াশোনা সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
অশ্রুসিক্ত চোখে, যন্ত্রণায় কাতর মাহেব চৌকিদার আকুল কণ্ঠে বলেন, “দেহের অঙ্গ হারিয়েছি, সংসারের সহায়-সম্পদ, শেষ সম্বল গরু, ছাগল এবং অটোরিকশাটা পর্যন্ত বেঁচে চিকিৎসায় শেষ করেছি। এখন আর লড়াই করার মতো এক ফোঁটা শক্তি বা সামর্থ্য আমার নেই। আমি তিলে তিলে মরতে চাই না, আমি আরও কিছুদিন বাঁচতে চাই। আমার অবুঝ ছোট মেয়েটার মুখের দিকে চেয়ে সমাজের দয়ালু মানুষগুলো কি আমাকে একটু সাহায্য করবেন না?”
আজ একজন অসহায়, সহায়-সম্বলহীন মানুষ জীবনের শেষ সীমান্তে দাঁড়িয়ে সমাজের মানবিক বিবেকের কাছে আকুতি জানাচ্ছেন। সমাজের বিত্তবান, সমাজসেবী, মানবিক হৃদয়বান ব্যক্তি এবং সরকারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে মাহেব চৌকিদারের পরিবারের পক্ষ থেকে জোর আকুল আবেদন—আপনারা যে যার সাধ্যমতো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। সকলের সামান্য সহানুভূতি ও আর্থিক সহায়তাই পারে একটি নিঃস্ব পরিবারকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং মাহেব চৌকিদারকে বেঁচে থাকার নতুন আলো দেখাতে।
যোগাযোগের উপায়:
মো. মাহেব চৌকিদার
ব্যক্তিগত নম্বর- 01339-941375



