
প্রকাশিত
নিজস্ব সংবাদদাতা, রংপুর:
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার জাফরপাড়া হাফিজিয়া মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একইসঙ্গে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং ভিন্নমুখী বক্তব্যে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। এমন পরিস্থিতিতে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
প্রাথমিকভাবে চারটি ভিডিও ক্লিপে কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করে জানায়, মাদ্রাসাটির মুহতামিম মোসাদ্দেক বিল্লাহ ও তার ছেলে রাকিব মিয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে অসদাচরণসহ অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে । এমন বক্তব্য দেয়া ভিডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
তবে কিছুদিনের ব্যবধানে একই শিক্ষার্থীদের ভিন্ন বক্তব্য দিতে দেখা যায়। তারা দাবি করে, তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের খারাপ কিছু ঘটনা ঘটেনি এবং আগের অভিযোগগুলো ‘মিথ্যা’ ছিল।
অন্যদিকে, মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষার্থীর ভাষ্য, “বড় হুজুর কারো সঙ্গে খারাপ কিছু করেননি, তবে মাঝে মধ্যে হাত-পা টিপে নিতে বলতেন”—এমন বক্তব্য নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
মাদ্রাসাটির আলিফ নামের এক শিক্ষার্থী প্রথমে অনৈতিক কর্মকান্ডের বিষয় নিয়ে ভিডিও তে জানায় যে, তাদের বড় হুজুর তার সাথে খারাপ কাজ করেছে, কিন্তু ঘটনার ৩ দিন পর অভিভাবকসহ এসে বলতে দেখা যায় আরেকটি ভিডিওতে সেখানে বলতে দেখা যায় ১০০ টাকার প্রলোভন দেখিয়ে পাশের মাদ্রাসার হাফেজ শাহানুর রহমান নামের এক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের দিয়ে মাদ্রাসা ও শিক্ষকের বিরুদ্ধে এসব বলতে বলেছে বলেও জানান ওই শিক্ষার্থীরা।
মাদ্রাসাটির আরেক শিক্ষার্থী মাহিম সেখানেও একটি ভিডিও ক্লিপের বক্তব্যে শোনা যায় তার সাথে অনৈতিক কর্মকান্ড করা হয়েছে। পরে ওই শিক্ষার্থীর সাথে কথা হলে সে বলে তাকে হাফেজ শাহানুর নামের একজন হুজুর ৫০০ টাকার দেয়ার কথা বলে এসব কথা বলতে বলেছেন। হুজুরের কোনো দোষ নেই বলেও জানান। তবে ওই শিক্ষার্থী আরও স্বীকার করেছেন যে বড় হুজুর অনেকের কাছ থেকে হাত পা টিপে নেন।
অভিযোগ রয়েছে মাদ্রাসাটির সাবেক এক শিক্ষক ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে প্রতিশোধ নিতে শিক্ষার্থীদের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে মিথ্যা অভিযোগ দিতে প্ররোচিত করেন ওই শিক্ষক। কৌশলে বক্তব্য মোবাইলে ধারণ করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ক্ষুণ্ন হয়।এবং এলাকাবাসী ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে এবং মাদ্রাসাটি বন্ধ করে দেয়।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদ্রাসার মুহতামিম মোসাদ্দেক বিল্লাহ ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অভিভাবককে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে বিষয়টি ‘ম্যানেজ’ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এমনকি এক অভিভাবকের একটি অডিও রেকর্ড আরএনবি নিউজের হাতে এসেছে সেখানে সেই অভিভাবককে বলতে শোনা যাচ্ছে ১ লাখ ২০ হাজার দিলেই আমার বাচ্চার বিষয় আর কোনো অভিযোগ নাই, আমি আর কোনো অভিযোগও দিবো না, এটা দেন তাহলেই হবি। “মোটা অঙ্কের টাকা পেলে নাকি সেই অভিভাবকের কোনো অভিযোগ থাকবে না”—যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আদিল রাসেদ বলেন, ঘটনাটি আসলেই সত্যি, তবে টাকা পয়সা দিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন মাদ্রাসার শিক্ষকরা। তিনিও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচারের দাবী করেছেন।
স্থানীয় আরিফ বিল্লাহ জানান, ঘটনাটি আসলেই সত্যি তাছাড়া কেনো সেই অভিযোগকারী শিক্ষার্থীদের টাকা পয়সা দিয়ে ম্যানেজের চেষ্টা করা হচ্ছে । ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ারও চেষ্টা করা হচ্ছে আর সুষ্ঠু তদন্ত করে অপরাধীদের বিচারের দাবীও করেছেন তিনি ।
বাবনপুর গ্রামের রুহুল আমিন মাষ্টার বলেন, একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ সত্যি দুঃখজনক, তবে এমন ঘটনা সত্যি হলে এসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কি করে শিক্ষার্থী ভর্তি করাবেন অভিভাবকরা? তাই অপরাধী যেই হোক সুষ্ঠু তদন্ত করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীও করেন তিনি ।
মদনখালী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আলী জানান মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষকরা অনৈতিক কর্মকান্ড করেছেন এমন কিছু ছাত্রের ভিডিওতে শুনেছি তারা বলেছে যে হুজুর তাদের সাথে খারাপ কিছু করেছে । ঘটনা যদি সত্যি হয় অপরাধীদের বিচারের দাবীও জানান তিনি ।
অভিযোগের বিষয়ে মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ রাকিব মিয়া বলেন, “আমাদের প্রতিষ্ঠানে কোনো অনৈতিক ঘটনা ঘটেনি। পাশের একটি মাদ্রাসার এক শিক্ষক, যিনি আগে এখানে ছিলেন, তিনি ষড়যন্ত্র করে শিক্ষার্থীদের দিয়ে মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়েছেন।”
অন্যদিকে মাদ্রাসার মুহতামিম মোসাদ্দেক বিল্লাহও একই সুরে বলেন, “এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। একটি পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে।” তিনিও ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন।
আবার অনৈতিক কর্মকান্ডের অভিযোগ এনে মাদ্রাসার দুই শিক্ষককে অভিযুক্ত করে লেমন নামের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক থানায় অভিযোগ করেছেন বলেও জানা যায় ।
লিমন নামের এক শিক্ষার্থীর মা লিমা খাতুনের সাথে মুঠোফোনে থানায় অভিযোগের বিষয়ে কথা হলে তিনি বলেন, যে তার সন্তানের সাথে যা ঘটেছে তার বিচার চাইতে থানায় অভিযোগ করেছি ।
এ বিষয়ে পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সোহেল রানার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষকের অনৈতিক কর্মকান্ড সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ পায়নি থানা পুলিশ ।
স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবী করছেন শিক্ষার্থীর অভিভাবক এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছে আর পীরগঞ্জ থানা পুলিশ বলছে এ ঘটনায় কোনো অভিযোগই পায়নি । তাহলে থানায় অভিযোগ না দিয়েও অভিযোগের নাটক সাজিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার পায়তারা চলছে না তো? সেটিও দেখার বিষয় বলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা ।
ঘটনার সত্যতা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হলেও এলাকাবাসীর একটাই দাবি—সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা হোক। তাদের ভাষায়, “অপরাধী যে-ই হোক, প্রমাণ সাপেক্ষে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”এ ঘটনায় দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন মহলের।



