ময়মনসিংহে শত, কোটি টাকার সরকারি জমি সাড়ে ৫ লাখে বিক্রি, রেজিস্ট্রেশন স্থগিত করলেন আদালত


দেশ সময় প্রকাশের সময় : ২০২৫-০৮-২৫, ১:৩০ অপরাহ্ন /
ময়মনসিংহে শত, কোটি টাকার সরকারি জমি সাড়ে ৫ লাখে বিক্রি, রেজিস্ট্রেশন স্থগিত করলেন আদালত
print news || Dailydeshsomoy

নিজস্ব প্রতিবেদক,

ময়মনসিংহ নগরীর পাটগুদামের শতকোটি টাকার সরকারি জমি মাত্র সাড়ে ৫ লাখে বিক্রির ঘটনায় গণমাধ্যমে প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। রোববার সকালে দুদকের সহকারী পরিচালক রাজু মোহাম্মদ সারোয়ার হোসাইনের নেতৃত্বে ৪ সদস্যের একটি দল সদর সাব-রেজিস্ট্রার ও জেলা জজ আদালতের সদর কোর্টের বেঞ্চ সহকারীর কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে।

এদিকে, বিতর্কিত জমি বিক্রির দলিলটির রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন আদালত।

রেকর্ড অনুযায়ী, সিএস খতিয়ান নম্বর ১৫৫৭ ও এসএ খতিয়ান নম্বর ২১০৯ এর জমির মালিক ছিলেন রেবতী মোহন দাস। ১৯৬৩ সালে এক্সিকিউশন কনভেয়েন্স ডিডের (লিখিত দলিল যা আইনিভাবে কার্যকর) মাধ্যমে জমিটি আদমজী জুট মিলস লিমিটেডের নামে হস্তান্তরিত হয়।

বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) তথ্যমতে, এই দলিলের নম্বর-১০৭, দলিলটি ১৯৬৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সম্পাদিত হয়। এর নথি বর্তমানে করাচি জেলা রেজিস্ট্রি অফিসে সংরক্ষিত। ওই দলিল মোতাবেক ১৯৬৪ সালে নামজারি সম্পন্ন হয় এবং পরবর্তী সময়ে খারিজ খতিয়ান প্রস্তুত হয়।

জুট মিল দীর্ঘদিন দখলে রেখে খাজনা পরিশোধ করলেও মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর জমিটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। বিআরএস জরিপে জমিটি সরকারি মালিকানায় (খতিয়ান নম্বর ১/১) রেকর্ডভুক্ত হয়। এর প্রায় ৬০ বছর পর ২০২২ সালে রেবতী মোহন দাসের ছেলে পরিচয়ে রবীন্দ্র মোহন দাস জেলা প্রশাসক ও বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলাটি চলতি বছরের ৮ মে খারিজ করে দেন আদালত।

এদিকে মামলাটি খারিজ হওয়ার আগেই ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে রবীন্দ্র মোহন দাস মিরাশ উদ্দিন সুমনকে আমমোক্তারনামা (মামলা চালানোর পাওয়ার) দেন। এর পর তিনি মামলাটি পুনর্জীবিত করে নতুন করে ছানি মামলা করেন, যার প্রাথমিক শুনানির তারিখ আগামী ২৮ আগস্ট।

ময়মনসিংহ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তথ্যমতে, মামলা চলমান থাকা অবস্থায় চলতি বছরের ৬ জুন জমিটির ৮৪ শতাংশ মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ টাকায় বিক্রির দলিল সম্পাদিত হয়। দাতা হিসেবে রবীন্দ্র মোহন দাসের নাম ব্যবহার করা হয় এবং তাঁর পক্ষে স্বাক্ষর করেন সিনিয়র সহকারী জজ পবন চন্দ্র বর্মণ। অথচ জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য শতকোটি টাকা বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্র।

পরে ঘটনায় গণমাধ্যমে নিউজ প্রকাশের পর তদন্তে নামে দুদক ও স্থানীয় প্রশাসন। পরে ময়মনসিংহের সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের বিচারক পবন চন্দ্র বর্মণ এ মামলায় বিতর্কিত দলিলটির সম্পাদন ও রেজিস্ট্রেশন সাময়িকভাবে স্থগিত করার নির্দেশ দেন।

আদেশে বলা হয়, রোববার নথি উপস্থাপনসহ দলিল বাতিলে ছানি মোকাদ্দমা করা হয়েছে। দরখাস্ত মঞ্জুর করা হলো। ২৭ এপ্রিলের ডিক্রিসহ দলিলের কার্যক্রম স্থগিত করা হলো।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আজিম উদ্দিন জানান, বিষয়ে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে গাফিলতির কিছু প্রমাণও পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে আদালতে একটি ছানি মামলা হয়েছে।

জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শাহজাহান কবির সাজু বলেন, আপাতত আদালতের নির্দেশে দলিলটির রেজিস্ট্রেশন স্থগিত হওয়ায় শতকোটি টাকার এই সরকারি সম্পত্তি বেহাত হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। তবে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত চক্রকে চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে এমন জালিয়াতি রোধ করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই এখন প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

দুদকের সহকারী পরিচালক রাজু মোহাম্মদ সারোয়ার হোসাইন সাংবাদিকদের বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ দেখে আমরা তদন্তে নামি। বিভিন্ন দপ্তরের গাফিলতির কিছু প্রমাণ পেয়েছি। আদালত থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে দলিল ও ডিক্রি বাতিলের জন্য। এ ঘটনার সঙ্গে যে বা যারা জড়িত তাদের বিষয়ে আরও অধিকতর তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।