
প্রকাশিত
সঞ্জিব দাস, গলাচিপা, পটুয়াখালী, প্রতিনিধি
সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে প্রায় এক যুগ ধরে প্রবাসে জীবন কাটাচ্ছেন এক সংগ্রামী মা। স্বামী পরিত্যক্ত হওয়ার পর তিন ছোট সন্তানকে রেখে ২০১৪ সালে জীবিকার সন্ধানে হংকং পাড়ি জমান তিনি। এরপর ২০১৯ সালেও জীবিকার প্রয়োজনে বিদেশে যেতে হয় তাকে। দীর্ঘ এই প্রবাসজীবনে সন্তানদের কাছ থেকে দূরে থাকলেও তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক মুহূর্তের জন্যও উদাসীন হননি তিনি।
তিন সন্তানকে নিরাপদে রেখে পড়াশোনা করানোর বিষয়টি নিয়ে একসময় গভীর দুশ্চিন্তায় পড়েন মা। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে তিনি পটুয়াখালী জেলা প্রশাসনের (ডিসি) শরণাপন্ন হন। পরে সরকারি শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে তিন সন্তানের আশ্রয় ও পড়াশোনার ব্যবস্থা হয়। সেখান থেকেই নতুন স্বপ্নে এগিয়ে যেতে শুরু করে তারা।
এরই মধ্যে তিন সন্তানের একজন ইশিতা আলী মীম পড়াশোনায় অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। বরিশালের রূপাতলী এলাকার আবদুল ওয়াহেদ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের কারিগরি শাখার দশম শ্রেণির নিয়মিত ছাত্রী ইশিতা ড্রেস মেকিং বিভাগে পড়াশোনা করছে। শ্রেণিতে তার রোল নম্বর ১। সম্প্রতি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জনের পাশাপাশি জিপিএ-৫ পাওয়ার কৃতিত্বও অর্জন করেছে সে।
বিদ্যালয়ের প্রত্যয়নপত্রে ইশিতা আলী মীমকে নিয়মিত ছাত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে তার জন্মতারিখ ১১ জুন ২০১১ এবং স্বভাব-চরিত্র ভালো বলেও প্রত্যয়ন করা হয়েছে।
শুধু ইশিতাই নয়, তার অন্য দুই ভাই-বোনও পড়াশোনায় এগিয়ে যাচ্ছে। একজন বরিশাল ব্যাপ্টিস্ট মিশনে এবং অন্যজন পটুয়াখালী কারিগরি স্কুলে পড়াশোনা করছে। তাদেরও ভালো ফলাফলের মাধ্যমে মায়ের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে পরিবারের।
সন্তানের সাফল্যের খবর প্রবাসে বসে শুনে আনন্দে কেঁদেছেন মা। একদিকে সন্তানদের অর্জনে তার বুক ভরে উঠেছে গর্বে, অন্যদিকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে তাদের পাশে থাকতে না পারার কষ্টও তাকে কাঁদায়।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, “সন্তানদের পাশে থেকে বড় করতে পারিনি। কিন্তু তাদের ভবিষ্যতের জন্যই জীবনের কঠিন সময়গুলো পার করেছি। তারা ভালো মানুষ হয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারলেই আমার সব কষ্ট সার্থক হবে।”
একসময় যাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগে প্রশাসনের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল, সেই সন্তানদের সাফল্যই আজ প্রবাসী মায়ের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। দীর্ঘ বিচ্ছেদ, একাকিত্ব আর কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোই যেন তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।
সন্তানরা শুধু ভালো ফলাফল নয়, সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মানবিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে, দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে, এটাই এখন এই মায়ের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।



