print news || Dailydeshsomoy

প্রকাশিত

সুমন ইসলাম, লালমনিরহাট

লালমনিরহাটে ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক মাদক নিরাময় কেন্দ্র ও হাসপাতাল স্থাপনের সরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বৃহত্তর জনস্বার্থে প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনার দাবি উঠেছে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, একই অর্থে একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হলে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

গত ১৬ আগস্ট দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী জেলার জন্য ১৫০ কোটি টাকার একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্র ও হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগের কথা জানান। সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে লালমনিরহাটে মাদক নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা একমত হলেও অনেকেই মনে করছেন, প্রকল্পটির পরিধি আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন।
স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, লালমনিরহাট জেলার জনসংখ্যা ১৪ লাখ ২৮ হাজারের বেশি। অথচ জেলার প্রধান সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ২৫০ শয্যার জেলা হাসপাতাল দীর্ঘদিন ধরেই জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলার অসংখ্য রোগীকে এখনও রংপুর, বগুড়া কিংবা ঢাকামুখী হতে হয়।
স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি আধুনিক জেলা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হলে শুধু লালমনিরহাট নয়, পার্শ্ববর্তী কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলার লাখো মানুষও উপকৃত হতে পারবেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই তিন উপজেলার সম্মিলিত জনসংখ্যা প্রায় ৯ লাখ। ফলে লালমনিরহাট ও আশপাশের এলাকার প্রায় ২৪ থেকে ২৬ লাখ মানুষের জন্য একটি আঞ্চলিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
সচেতন নাগরিকদের দাবি, মাদকাসক্তি চিকিৎসাকে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা হলে একই বিনিয়োগ থেকে বহুমাত্রিক সুফল পাওয়া সম্ভব হবে। একজন মাদকাসক্ত মানুষের চিকিৎসা যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি সাধারণ রোগীরাও উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবেন।
এদিকে মাদক প্রতিরোধ কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তাদের মতে, বছরের পর বছর বিভিন্ন সভা, সেমিনার, মানববন্ধন ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হলেও এর ফলাফল মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। কতজন শিক্ষার্থী বা তরুণ এসব কর্মসূচি থেকে উপকৃত হচ্ছে, কতজন ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিকে কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনা হচ্ছে কিংবা কতটা সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠছে—এসব বিষয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতা প্রয়োজন।
স্থানীয় সমাজকর্মী ও নাগরিক প্রতিনিধিরা মনে করেন, মাদক প্রতিরোধকে কেবল আইনশৃঙ্খলা বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। এটি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবার, কর্মসংস্থান, খেলাধুলা, মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তাই প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে শিক্ষক, অভিভাবক, সমাজের প্রবীণ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের আরও সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।
তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৫০ কোটি টাকার প্রকল্পটি একটি সমন্বিত আধুনিক হাসপাতাল ও মাদক চিকিৎসা-পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে বাস্তবায়ন করা হলে সেখানে উন্নত জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা, মেডিসিন ও সার্জারি বিভাগ, নারী ও প্রসূতি সেবা, শিশু চিকিৎসা, হৃদরোগসহ বিশেষায়িত চিকিৎসা, আধুনিক ল্যাব ও ডায়াগনস্টিক সুবিধা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং আন্তর্জাতিক মানের মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন বিভাগ স্থাপন করা যেতে পারে।
এছাড়া পরিবারভিত্তিক কাউন্সেলিং, তরুণদের জন্য প্রতিরোধমূলক কাউন্সেলিং এবং মাদক প্রতিরোধে গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক কর্মসূচি পরিচালনার ব্যবস্থাও রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, লালমনিরহাটের পরিচয় একটি মাদকপ্রবণ জেলা হিসেবে নয়; বরং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।
এ বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সচেতন মহল বলছে, মাদক নিরাময় কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার না করে প্রকল্পটিকে আরও বৃহত্তর জনকল্যাণমূলক রূপ দেওয়া হলে একই বিনিয়োগে লাখো মানুষের স্বাস্থ্যসেবার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।