print news || Dailydeshsomoy

প্রকাশিত, ২২ মার্চ, ২০২১

মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি ঃ

শিশুর জন্মের পর থকে ২৮ দিন পর্যন্ত তাকে নবজাতক বলা হয়। নবজাতকের একটি অন্যতম প্রধান রোগ হলো জন্ডিস।
আমাদের শরীরে যে রক্ত হয়, প্রতিনিয়ত সে রক্তটা ভেঙ্গে যায়। ভেঙ্গে গিয়ে নতুন রক্ত তৈরি হয়। এখান থেকে বিলুরুবিন বের হয়।
এর রংটা হলুদ। এর পরিমাণ যখন বেড়ে যায় তখনই জন্ডিস হয়। জন্মের পর অনেক শিশুর শরীরে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে যায়। বড়দের ক্ষেত্রে বিলিরুবিনকে নিয়ন্ত্রণ করে যকৃত।
নবজাতকের ক্ষেত্রে তার যকৃত পুরোপুরি তৈরি হয় না বলে বিলিরুবিন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না তার শরীর।
তবে বেশির ভাগ সময়ই নবজাতক ধীরে ধীরে বুকের দুধ খাওয়া শুরু করলে তার শরীরে বিলিরুবিন বণ্টন হয়ে যায়। আর শিশু জন্মের দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে জন্ডিসও সেরে যায়। তবে তিন সপ্তাহের বেশি সময় জন্ডিস থাকলে তা শিশুর জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

নবজাতকের জন্ডিস কেন হয়?
১) বাচ্চা যদি জন্মের পর মায়ের দুধ কম পায়, বেশি খেতে পারে না অথবা মা যদি বাচ্চাকে বেশি দুধ দিতে না পারে বা দুধ যদি কম আসে- সেই সব ক্ষেত্রে দেখা যায় বাচ্চার জন্ডিস বৃদ্ধি পায়। সেই জন্ডিস সাধারণত দুই থেকে তিনদিনে বৃদ্ধি পেয়ে ছয়-সাতদিনের দিকে কমে যাবে।
২) কিছু কিছু মায়ের দুধে এমন একটি উপাদান আছে, যেটা বিলুরুবিনকে লিভার দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে বের করে দেওয়ার ক্ষমতাকে বাধা দেয়। এতে শিশুর জন্ডিস বেড়ে যায়।
৩) মায়ের যদি নেগেটিভ রক্তের গ্রুপ থাকে আর শিশুর যদি পজিটিভ রক্তের গ্রুপ হয়, সেই ক্ষেত্রেও জন্ডিস বেড়ে যাবে। আর মা যদি ও পজিটিভ থাকে, শিশু যদি এ বা বি পজিটিভ থাকে, সেই ক্ষেত্রেও জন্ডিসের মাত্রা বেড়ে যাবে।
৪) প্রসব যদি জটিল হয়, যেমন হয়তো শিশু মাথায় একটু আঘাত পেয়েছে, যেমন ক্যাফোলোহেমাটোমা

নবজাতকের জন্ডিসের লক্ষণ কী?
১) হলুদ রঙের চামড়া হল জন্ডিসের অন্যতম দৃশ্যমান লক্ষণ। নবজাতক জন্ডিসের চামড়ার উপসর্গ প্রথমে মুখে দেখা যায় এবং তারপর শরীরের অন্যান্য অংশে ধীরে ধীরে প্রদর্শিত হয়।
২) ঝিমুনিভাব তীব্র জন্ডিসের একটি উপসর্গ।
৩) স্নায়বিক লক্ষণ যেমন খিচুনি , উচ্চ মাত্রার কান্না, পেশীর ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে। জটিলতা এড়াতে এই লক্ষণ দেখলে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক।
৪) শিশু গাঢ় এবং হলুদ প্রস্রাব ত্যাগ করে।
৫) শিশুর সঠিকভাবে খাচ্ছেনা বা চুষছে না।
৬) হেপাটাইটিস এবং বিলিয়ারি এটরেসিয়া, যুক্ত বিলিরুবিনের মাত্রার বৃদ্ধি ঘটায়। এই বেড়ে যাওয়া থেকে জন্ডিস হয় যা ফ্যাকাশে মল এবং গাঢ় প্রস্রাব দ্বারা চিহ্নিত করা হয়।
৭) হলুদ রঙের চোখের সাদা অংশ এর আরেকটি প্রধান চিহ্ন। চরম ক্ষেত্রে, হাত পা এবং পেটও হলুদ রঙের দেখায়।

নবজাতকের জন্ডিসের চিকিৎসা কী?
সাধারণত জন্মগত কারণে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ জন্ডিস পরিলক্ষিত হয়। এসবের বেশির ভাগই ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস বা সাধারণ জন্ডিস।এক্ষেত্রে নবজাতককে প্রতিদিন আধা ঘণ্টা করে ১০ দিন সূর্যের আলোতে রাখলেই ভালো হয়ে যায়। নবজাতকের রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা কেমন, শিশু কত সপ্তাহে জন্ম গ্রহণ করেছে, বিলিরুবিন কী পরিমাণে বাড়ছে তার ওপর চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা নির্ভর করে। তবে নবজাতকের বিলিরুবিন যদি অতিমাত্রায় বাড়তে থাকে, তবে হাসপাতালে চিকিৎসা করানো উচিত। হাসপাতালে চিকিৎসা হিসেবে সাধারণত ফটোথেরাপি প্রয়োগ করা হয়।

জন্ডিস হলে নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়ানো যাবে?
কোনো অবস্থায়ই নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়ানো থেকে বিরত রাখা যাবে না। নিয়মিত দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর পর বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। বিশেষ করে ফিজিওলজিক্যাল বা স্বাভাবিক জন্ডিসের মূল চিকিৎসাই হচ্ছে ঠিকমতো বুকের দুধ খাওয়ানো।

নবজাতকের জন্ডিস প্রতিরোধে করণীয় কী?
১) মায়ের পুষ্টি, বিশ্রাম, উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হাঁপানী একলাম্পসিয়া ইত্যাদি ঠিক রেখে অপুষ্ট শিশু জন্মদান রোধ করতে হবে।
২) বাচ্চাকে পরিষ্কার ও শুষ্ক রাখবেন এবং হাত না ধুয়ে বাচ্চাকে কেউ ধরবেন না। অন্তত প্রথম ১ মাস।
৩) বাচ্চাকে শালদুধ দিন এবং শুধুমাত্র বুকের দুধ দিত থাকুন।
৪) মা হওয়ার আগেই মাকে হেপাইটিস বি -এর টিকা দিন।
৫) মায়ের রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ এবং বাবার পজেটিভ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ মত এন্টি-ডি নিন।
৬) মা এন্টিথাইরয়েড ওষুধ খেলে বা হাইপোথাইরয়েড হলে চিকিৎসককে তা জানাবেন।

ডা. মো: সাইফুল আলম
এম.ডি. (রুদেন ইউনিভার্সিটি)
মস্কো, রাশিয়া।