print news || Dailydeshsomoy

প্রকাশিত, ১০ মার্চ ২০২১

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঃ

ডায়রিয়া খুব প্রচলিত একটি সমস্যা। এটি বড়-ছোট সবারই হতে পারে। তবে ছোটদের বেলায় এটি মারাত্মক আকার ধারণ করে। কারণ, শিশুদের ওজন বড়দের তুলনায় কম থাকে। তাই তারা খুব দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ে। শিশুরা এক থেকে দুই বার পাতলা পায়খানা করতে পারে। তবে এটি ডায়রিয়া নয়। যদি একটি শিশু, দিনে পাঁচ থেকে ছয়বার পাতলা পায়খানা করে তখনই তাকে আমরা ডায়রিয়া বলব। সাধারণত দুই বছরের নিচের বাচ্চাদের ডায়রিয়া ভাইরাস দিয়ে হয়। ভাইরাসের মধ্যে রোটা ভাইরাস বেশি হয়। এ ছাড়া ব্যাকটেরিয়া দিয়েও হতে পারে। একটু বড় বাচ্চাদের সাধারণত ব্যাকটেরিয়া দিয়েই হয়। এ ছাড়া অন্য অনেক কারণেই ডায়রিয়া হতে পারে।

ডায়রিয়ার প্রকারভেদ:
তীব্র ডায়রিয়া: এটা হঠাৎ শুরু হয়ে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন স্থায়ী হয়। তবে কখনো ১৪ দিনের বেশি নয় এবং পায়খানার সঙ্গে কোনো রক্ত যায় না।
দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়া: পাতলা পায়খানা ১৪ দিনের বেশি স্থায়ী হলে।
জলীয় ডায়রিয়া: মল খুবই পাতলা হয়, ক্ষেত্রবিশেষে একেবারে পানির মতো। মলে কোনো রক্ত থাকে না।
আমাশয় বা ডিসেন্ট্রি: রক্তমিশ্রিত পায়খানা।

ডায়রিয়ার উপসর্গ:
১.শিশু স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি ঘন ঘন মল ত্যাগ করে।
২.মল পাতলা গন্ধযুক্ত এবং মিউকাসে ভরা হয়।
৩.জ্বর থাকে এবং বাচ্চার ওজন কমে যাচ্ছে বলেও মনে হয়।
৪.সারাক্ষণ কান্নাকাটি করে এবং খিদে পায় না।
৫.ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ দেখা দেয়। যেমন চোখ বসে যাওয়া, মুখগহ্বর শুকনো হয়ে যায়, গাঢ় হলুদ প্রস্রাব এবং কাঁদার সময় চোখে জল না আসা। শরীরে জলের পরিমান কমে যাওয়া।
৬.জ্বর আসা ও বমি হওয়া।

ডায়রিয়া যে সব কারণে হয়ে থাকে :
১.জীবাণু সংক্রামিত হলে ডায়রিয়া হয়।
২.দূষিত পানি পানের মাধ্যমে ডায়রিয়া ছড়ায়।
৩.দূষিত খাবার বা পঁচা-বাশি খাবার খেলে ডায়রিয়া হয়ে থাকে।
৪.অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করলে বা ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় না রাখলেও ডায়রিয়া হতে পারে।

সংক্রামক ডায়রিয়া:
১.ভাইরাসজনিত। যেমন : রোটা ভাইরাস, এস্ট্রো ভাইরাস, এডেনোভাইরাস ইত্যাদি।
২.ব্যাকটেরিয়াজনিত। যেমন : সালমোনেলা, শিগেলা, ই কলাই, ভিব্রিও কলেরি, ক্যামপাইলোব্যাকটর ইত্যাদি।
৩.পরজীবীজনিত। যেমন : জিয়ারডিয়া, ক্রিপটোসপরিডিয়াম, সাইক্লোসপরা ইত্যাদি।

অসংক্রামক ডায়রিয়া :
১.কিছু অসুখ, যেমন : ডাইভার্টিকুলাইটিস, পায়ুপথে বা অন্ত্রে ক্যানসার, আইবিএস, আলসারেটিভ কলাইটিস ইত্যাদি।
২.কিছু ওষুধ, যেমন : ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ অ্যান্টাসিড, বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক ইত্যাদি।

বাচ্চাদের ডায়রিয়ার ঘরোয়া প্রতিকার:
১. প্রচুর পরিমাণে পানীয়
ছোটো বাচ্চাদের দুধ বা ফর্মূলা মিল্ক খাওয়াতে পারেন, যদি বমি না করে। একটু বড় বাচ্চাদের জল, ইলেক্ট্রোলাইট দ্রবণ বা ORS ( খাবার স্যালাইন ) অল্প অল্প করে বার বার দেওয়া যেতে পারে। ডাবের পানিও দিতে পারেন, এটি ইলেক্ট্রোলাইটের সমৃদ্ধ। তবে মায়ের বুকের দুধ এইসময় অনেক বেশি নিরাপদ।
২.ডায়রিয়া খুব তাড়াতাড়ি শিশুদের দুর্বল করে তোলে। তাই শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পৌঁছে দিতে সঠিক খাবার খাওয়ানো খুব জরুরি। একদম ছোটো বাচ্চা যা কেবলমাত্র মায়ের বুকের দুধের উপর নির্ভরশীল তাদের ঘন ঘন দুধ খাওয়াতে বলা হয়ে থাকে । আর যাদের বয়স একটু বেশি তাদের ঘরে তৈরি হালকা খাবার ৩-৪ ঘণ্টা অন্তর অল্প অল্প করে খাওয়াতে হবে।
৩.খাওয়াদাওয়ার পাশাপাশি শিশুকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে।স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। নিয়মমত ডায়পার বদলানো, ভালো করে সাবান জল দিয়ে বাচ্চার নিচের অংশ পরিষ্কার করা, শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে তবেই নতুন ডায়পার পড়ানো ইত্যাদি । প্রয়োজনে ডায়পার পড়ানোর আগে ক্রিম বা পাওডার দিয়ে দিতে পারে। নয়তো ডাইপার জন্য র‍্যাশের সমস্যা দেখা দিতে পারে ।

খাবার স্যালাইন বানানোর সঠিক নিয়ম :
খাবার স্যালাইনের যে প্যাকেটগুলো পাওয়া যায়, আধা লিটার ফুটন্ত ঠাণ্ডা পানির মধ্যে গুলিয়ে নিতে হবে। কখনো অল্প একটু স্যালাইন অল্প একটু পানি, কখনো পানি বেশি, পানি কম, স্যালাইন বেশি বা কম এভাবে গুলানো যাবে না। একদম আধা লিটার পানিতে এক প্যাকেট, স্যালাইন গুলাতে হবে। পানিটি হতে হবে বিশুদ্ধ। ফুটানো ঠাণ্ডা পানিতে এক প্যাকেটের সম্পূর্ণটি দিয়ে ভালোভাবে মেশাতে হবে। এরপর একে ঢাকনা দিয়ে রাখতে হবে। এটা আট থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত রাখা যায়। একটু আগেভাগে এটি খাইয়ে দিতে হবে। ছয় থেকে আট ঘণ্টার মধ্যে খাওয়ানো ভালো। এরপর যদি শেষ না হয় ফেলে দিতে হবে। আবার নতুন করে বানাতে হবে। অনেক সময় ফ্রিজে রেখে সংরক্ষণের চেষ্টা করেন, এটি করা যাবে না। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখতে হবে। গরমের দিন হলে আট ঘণ্টা রাখা ভালো, ঠাণ্ডার দিন হলে ১২ ঘণ্টা রাখা যেতে পারে।
ডায়রিয়া হলেও বুকের দুধ বন্ধ করা যাবে না। বরং তখন বেশি বেশি করে বুকের দুধ খাওয়াতে হবে।
এছাড়া শিশুদের মধ্যে নিম্নোক্ত উপসর্গগুলির দেখা গেলে সরাসরি একজন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ :
১.২৪ ঘন্টার বেশি ডায়রিয়া হলে।
২.যদি ১০২ ডিগ্রী বা তার বেশি জ্বর থাকলে।
৩.তলপেট বা মলদ্বারে গুরুতর ব্যাথা অনুভব করা।
৪.মলের সাথে যদি রক্ত বের হয়। ৫.মলের রং যদি কালো হয়।
৬.পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে।

ডা: মো: সাইফুল আলম।
এম.ডি. (রুদেন ইউনিভার্সিটি )
মস্কো, রাশিয়া।