
হারুন অর রশিদের প্রতিবেদন ঃ
সোনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন আমরা সবাই দেখি। কিন্তু প্রতিদিন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, নারী ও শিশু নির্যাতন, এমনকি ধর্ষণের পর হত্যার খবর দেখে বিবেক প্রশ্ন তোলে—আমরা আসলে কোন পথে এগোচ্ছি?
আজ শুধু শিশু নয়, কিশোরী, তরুণী, এমনকি বয়স্ক নারীরাও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন।
উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনা আর শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়; গ্রামের পর গ্রামেও নারী ও শিশুরা ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কখনো বাবার সামনে মেয়েকে, কখনো স্বামীর সামনে স্ত্রীকে লাঞ্ছিত করার মতো নির্মম ঘটনাও সমাজকে নাড়া দেয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করে থাকে। অনেক দেশে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এমনকি কিছু দেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রয়েছে। অপরাধের ধরন, ভুক্তভোগীর বয়স এবং ঘটনার ভয়াবহতার ওপর ভিত্তি করে শাস্তির মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে উন্নত দেশগুলোতে শুধু কঠোর শাস্তি নয়, দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর বিচার প্রক্রিয়ার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশেও ধর্ষণের বিরুদ্ধে কঠোর আইন রয়েছে। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু জনগণের বড় প্রশ্ন হলো—আইন থাকার পরও কেন অনেক ক্ষেত্রে বিচার দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে যায়? কেন ভুক্তভোগী পরিবারকে বছরের পর বছর ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থাকতে হয়?
এমন ঘটনার পর যখন কোনো অসহায় বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমি বিচার চাই, কিন্তু বিচার পাব কোথায়?”—তখন সেটি শুধু একজন পিতার আর্তনাদ নয়, বরং পুরো জাতির বিবেকের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্বব্যাপী নারীর প্রতি সহিংসতা একটি বড় মানবিক সংকট। জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। প্রায় ৮৪০ মিলিয়ন নারী জীবদ্দশায় যৌন বা সঙ্গীর সহিংসতার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন।
অপরাধীদের জন্য সবচেয়ে বড় বার্তা হওয়া উচিত—অপরাধ করলে কোনোভাবেই পার পাওয়া যাবে না। দ্রুত তদন্ত, স্বচ্ছ বিচার এবং শাস্তির নিশ্চিত প্রয়োগই পারে অপরাধের প্রবণতা কমাতে।
আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে কোনো বাবা ক্ষোভ ও বেদনায় বলতে বাধ্য হন, “এটা সোনার বাংলাদেশ নয়, এটা ধর্ষণের বাংলাদেশ।” আমরা চাই এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি নারী ও শিশু নিরাপদ থাকবে, যেখানে ন্যায়বিচার শুধু একটি শব্দ নয়, বাস্তবতার প্রতিফলন হবে।
বাংলাদেশের পরিচয় হোক উন্নয়ন, মানবতা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের; অপরাধ, নির্যাতন ও ভয়ভীতির নয়। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিকের সম্মিলিত উদ্যোগেই গড়ে উঠতে পারে একটি নিরাপদ, মানবিক ও সত্যিকারের সোনার বাংলাদেশ।