
রাকিবুল হাসান আহাদ, বিশেষ প্রতিনিধিঃ
বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকা সংবাদ প্রকাশের জেরে স্বামীর মৃত্যুর পর সম্পত্তি দখলের জন্য স্বামীর ভাইদের দ্বারা তিন এতিম সন্তানসহ অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়েছে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর পৌর এলাকার প্রয়াত মেয়র প্রার্থী শহিদের পরিবার।
২৬ জানুয়ারি তিন এতিম সন্তান ও তাদের মাকে নিজ বাসায় তালাবদ্ধ করে অবরুদ্ধ করা হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি পুলিশ গিয়ে তালা খুলে দেয়।
গত ২৬ জানুয়ারি এ ঘটনা ঘটে। পারিবারিকভাবে মুক্ত হতে না পেরে শহিদের স্ত্রী ৩০ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত একটি সাধারণ ডায়েরির আবেদন শ্রীপুর মডেল থানায় পাঠিয়ে নিরাপত্তা চান। থানায় ওসি না থাকায় পরিদর্শক তদন্ত তাৎক্ষণিকভাবে একজন এসআইকে (এসআই সুমন) ঘটনাস্থলে পাঠান। এসআই ঘটনাস্থলে গিয়ে জিডির সত্যতা পান বলে গণমাধ্যমকে জানান।
দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ঘটনাস্থলে থাকা অবস্থায় একটি ফোন আসলে সুমন বের হয়ে যান। ফলে অবরুদ্ধ পরিবারকে মুক্ত করতে পারেনি দারোগা সুমন। ৩ ফেব্রুয়ারি সংবাদ প্রকাশের পর দিন পুলিশ গিয়ে তালা খুলে তাদের মুক্ত করে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গাজীপুর জেলার শ্রীপুর পৌর এলাকার মাওনা ওভারব্রিজের পশ্চিম পাশে সদ্যপ্রয়াত মেয়র প্রার্থী শহীদুল্লাহ শহিদের পরিবার নিরাপত্তা আতঙ্কে পড়ে যায়। শহিদের ভাইয়েরা মরহুম শহীদুল্লাহর সম্পত্তি দখল করে তিন এতিম শিশুসন্তান ও শহীদুল্লাহর স্ত্রীকে নিজ বাসায় অবরুদ্ধ করে রাখেন তার স্ত্রীর অভিযোগ।
ঘটনাস্থল থেকে বেরিয়ে সুমন বাদীপক্ষকে ওসির সঙ্গে কথা বলতে বলেন। গভীর রাত হওয়ায় শহীদুল্লাহর শ্বশুর শেখ আব্দুর রাজ্জাক পরদিন বিকালে ওসির কাছে গেলে ওসি প্রতিপক্ষ এসেছিল বলে রাজ্জাককে জানিয়ে ঘটনা আপস করে দেবেন বলে জানান।
এ সময় একজন সংবাদকর্মী জিডি গ্রহণ করা হবে কিনা জানতে চাইলে ওসি তার ওপর চড়াও হন। ফলে ভিকটিমের আবেদন জিডি,অভিযোগ বা মামলা রেকর্ড হয়নি।
এদিকে বিষয়টি গণমাধ্যমে ফলাওভাবে প্রচারিত হলে এসআই সুমন দ্বিতীয়বারের মতো ঘটনাস্থলে যান এবং ৭টির মধ্যে একটি তালা খুলে দেন। গত ৫ ফেব্রুয়ারি দুপুরে ওসির পরামর্শে পারিবারিকভাবে বসে বিষয়টি নিষ্পত্তি করার খসড়া তৈরি হয়।
স্বামীর সম্পদ ও তার পরিবারের নিরাপত্তার লিখিত নিশ্চয়তা না পেয়ে ভিকটিম আপসনামায় স্বাক্ষর করেননি। আর প্রতিপক্ষ নানা কৌশলে আপসনামায় ভিকটিমের স্বাক্ষর নেয়ার চেষ্টা করছে। ঘটনার খবর পেয়ে স্থানীয় এমপি ইকবাল হোসেন সবুজ ভিকটিমের সঙ্গে কথা বলে ১১ ফেব্রুয়ারি বসে সমস্যা সমাধান করে দেবেন বলে আশ্বাস দেন।
শ্রীপুর থানার একটি সূত্র জানায়, কিছুদিন আগে অনুষ্ঠিত শ্রীপুর পৌর নির্বাচনে বিএনপির বিদ্রোহী মেয়র প্রার্থী হিসেবে শাহ আলম নির্বাচন করেন। নির্বাচনের দিন ভ্রাম্যমাণ আদালতের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগের ঘটনায় শাহ আলম থানায় আটক হন। পুলিশ কিছুক্ষণ পর তাকে ছেড়ে দেয়। সেই থেকে শাহ আলমের সঙ্গে ওসির একটি ব্যক্তিগত সখ্য গড়ে উঠে।
প্রসঙ্গত, গাজীপুর জেলার শ্রীপুর পৌরসভার প্রয়াত মেয়র প্রার্থী শহীদুল্লাহ শহিদের স্ত্রী তিন সন্তানসহ ৯ দিন ধরে নিজ বাসায় অবরুদ্ধ থাকেন। অষ্টম দিনে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় বাসার গেট ভেঙ্গে একটি কক্ষ তছনছ করা হয়েছে। এবিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়ায় এতিম পরিবারের নিরাপত্তার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন প্রয়াত শহিদের স্ত্রী।
৩ ফেব্রুয়ারি ভিকটিম জানান, প্রতিপক্ষ শাহ আলম লোকজন নিয়ে তার বাসায় যাতায়াতের একমাত্র পকেট গেট ভেঙ্গে নিয়ে গেছেন। এ সময় তারা শহিদের বাসায় প্রবেশ করে জিনিসপত্র নিয়ে যায়। খবর পেয়ে এসআই সুমন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বাসাটি মুক্ত করতে পারেনি।
এর আগে ২ ফ্রেব্রুয়ারি রাতে শহিদের স্ত্রী শাহীন সুলতানা সুইটি গণমাধ্যমকে এ খবর নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, তার স্বামী শহীদুল্লাহ শহিদ শ্রীপুর পৌরসভায় মেয়র পদে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে দুইবার নির্বাচন করলেও শেষবার নির্বাচনের মাঝপথে মারা যান। এতে নির্বাচন স্থগিত হওয়ার পর পুনরায় তফসিল হয়ে নির্বাচন সম্পন্ন হয়। এ নির্বাচনে শহিদের ভাই শাহ আলম ধানের শীষের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে পরাজিত হন। ২০২০ সালের ৯ ডিসেম্বর তার স্বামী ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে মারা যান।
সুইটির ভাষ্যমতে, তার স্বামীর যাবতীয় চিকিৎসা স্বামীর ভাই শাহ আলম, মোস্তফা কামাল ও শহিদের ভগ্নীপতি হারুনর রশিদ সম্পন্ন করেন। স্বামীর চিকিৎসার কথা বলে চেকের মাধ্যমে ২০ লাখ ও নগদ ৫ লাখ টাকা নেয় তারা। কিন্তু চিকিৎসার বিষয়ে সুইটিকে আড়ালে রাখেন ওই তিনজন। পরবর্তীতে স্বামীর মৃত্যু নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন তৈরি হলে সুইটিকে বাসা থেকে বের হতে নিষেধ করেন ওই তিন ব্যক্তি। একপর্যায়ে ২৬ জানুয়ারি রাতে শাহ আলম সুইটির বাসার চারিদিকে তালা লাগিয়ে দেন।
সকালবেলা একটি পকেট গেট খোলা থাকায় সুইটি বাইরে এসে দেখেন ৭টি গেটে তালা লাগানো। নিরাপত্তাকর্মীর কাছ থেকে সুইটি জানতে পারেন শাহ আলম তালা মেরে চাবি নিয়ে গেছেন। পরবর্তী সময় শাহ আলম শহিদের বাসায় অবস্থানরত স্ত্রী ও সন্তানদের নজরবন্দি করতে সিসি টিভির নিয়ন্ত্রণও নিয়ে নেয়।
সোমাবার রাতে সুইটি জানান, ওসি সাহেব সিভিল পোশাকে বাসায় এসেছিলেন। আপসের কথা জিজ্ঞাসা করেছেন। এরপর একটি লিখিত আপসনামা নিয়ে বাসায় বারবার লোকজন আসছেন। এ অবস্থায় এমপি সাহেব বলেছেন- তিনি সব ঠিক করে দেবেন।