

প্রকাশিত
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
চাঁদাবাজি, মাদক, দখলবাজি আর আতঙ্কে রাজবাড়ী
রাজবাড়ীতে যুবদল থেকে বহিষ্কৃত নেতা এস এম কাউসার মাহমুদকে ঘিরে বাড়ছে আতঙ্ক ও উদ্বেগ।
কেন্দ্রীয়ভাবে দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর তার প্রভাব কমার বদলে আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, জমি দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন, হত্যা হুমকি এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে এখন রাজবাড়ী পৌর এলাকার আলোচিত ও বিতর্কিত এক নাম এস এম কাউসার মাহমুদ। স্থানীয়দের ভাষ্য, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া এবং শক্তিশালী বলয়ের কারণে দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন তিনি।
সম্প্রতি এক পুলিশ সদস্যকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার ঘটনায় এস এম কাউসার মাহমুদের নাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনায় আসে। অভিযোগ রয়েছে, মাদকবিরোধী অবস্থান নেওয়ায় ওই পুলিশ সদস্যকে কটূক্তি ও হুমকি দেন তিনি। ঘটনাটি নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে কেন্দ্রীয় যুবদল তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, বহিষ্কারাদেশ কার্যকর হওয়ার পরও তার কর্মকাণ্ডে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং আগের তুলনায় আরও আক্রমণাত্মক আচরণ করছেন তিনি ও তার অনুসারীরা।
রাজবাড়ী পৌর এলাকার বিভিন্ন মহল্লা ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এস এম কাউসার মাহমুদকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের নীরব আতঙ্ক কাজ করছে। অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ব্যবসায়ী ও বাসিন্দা জানান, এস এম কাউসার মাহমুদের বিরুদ্ধে কথা বললেই তার বাহিনীর সদস্যরা বাড়িতে গিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর, হামলা কিংবা এলাকা ছাড়ার হুমকি দেওয়া হয়।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “এলাকার সবাই ভয় পায়। কেউ মুখ খুলতে চায় না। কারণ আজ কথা বললে কাল বাড়িতে হামলা হতে পারে।”
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে এস এম কাউসার মাহমুদ ও তার অনুসারীরা একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। বাজার, পরিবহন, ছোট ব্যবসা এবং নির্মাণকাজসহ বিভিন্ন খাত থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। যারা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান, তাদের ব্যবসা পরিচালনায় বাধা দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
জমি দখল ও প্রভাব বিস্তার নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব খাটিয়ে জমি দখল, ভয় দেখিয়ে কম মূল্যে জমি লিখে নেওয়া এবং প্রতিপক্ষকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার মতো ঘটনাও ঘটছে। কেউ বিরোধিতা করলে তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী বাহিনী ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ। কয়েকজন বাসিন্দা জানান, রাতের অন্ধকারে গিয়ে বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে।
একজন ভুক্তভোগীর ভাষ্য, “জমি নিয়ে প্রতিবাদ করেছিলাম। পরে আমাকে বলা হয়, মামলা করলে বা বেশি কথা বললে পরিবার নিয়ে এলাকায় থাকতে পারব না।”
মাদক কারবার নিয়েও রয়েছে বিস্তর আলোচনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, এস এম কাউসার মাহমুদের অনুসারীদের একটি অংশ এলাকায় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে মাদকের বিস্তার বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরা। যারা মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন, তাদের নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি দাবি করেছেন, মাদকবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার কারণে তাদের ওপর হামলার চেষ্টা চালানো হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব অভিযোগের পরও আইনগত পদক্ষেপ নিতে ভয় পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয়দের ভাষ্য, থানায় অভিযোগ দিলে পরবর্তীতে আরও বড় ধরনের হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে অধিকাংশ ভুক্তভোগী প্রকাশ্যে আসতে চান না। অনেকে অভিযোগ করেছেন, প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে এস এম কাউসার মাহমুদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
এ বিষয়ে স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের মতে, একজন বহিষ্কৃত নেতার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ থাকার পরও যদি তিনি প্রকাশ্যে একইভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন, তাহলে সাধারণ মানুষের আইনের প্রতি আস্থা কমে যাবে। তারা বলছেন, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।
এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনেও এস এম কাউসার মাহমুদকে নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করাতে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন বলেও জানা গেছে। তবে দলীয়ভাবে তার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো নতুন সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের আরেকটি বড় প্রশ্ন এস এম কাউসার মাহমুদের হঠাৎ বিত্তশালী হয়ে ওঠা নিয়ে। কয়েক বছর আগেও সাধারণ জীবনযাপন করলেও বর্তমানে বিলাসবহুল গাড়ি, প্রভাবশালী চলাফেরা এবং অর্থবিত্তের প্রদর্শন নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, অল্প সময়ের মধ্যে তার এই জীবনযাত্রার পরিবর্তনের উৎস খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “আগে তাকে সাধারণভাবেই দেখা যেত। এখন হঠাৎ করে এত প্রভাব, এত টাকা—এসব নিয়ে মানুষের প্রশ্ন তো থাকবেই।”
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এস এম কাউসার মাহমুদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন দাবি করেছেন, রাজনৈতিকভাবে তাকে হেয় করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযোগ ছড়ানো হচ্ছে। যদিও স্থানীয়দের বড় একটি অংশ সেই বক্তব্য মানতে নারাজ।
রাজবাড়ীর সচেতন নাগরিকরা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। তাদের মতে, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবার চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
তারা মনে করেন, একজন ব্যক্তি যতই প্রভাবশালী হোন না কেন, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অন্যথায় ভয় ও নীরবতার সংস্কৃতি আরও গভীর হবে, আর সাধারণ মানুষ ক্রমেই আস্থা হারাবে আইন ও প্রশাসনের ওপর।