
প্রকাশিত
ইমাম হোসাইন কিরণ।।
আমাদের এলাকার (জনতা বাজার,চৌধুরীহাট, চরপার্বতী, কোম্পানীগঞ্জ, নোয়াখালী) একটি গুরুতর সমস্যা এখন অসাধু মাটি ব্যবসা। কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থে ফসলি জমি কেটে মাটি বিক্রি করছে, যার ফলে সাধারণ কৃষক ও জমির মালিকরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
দুঃখজনকভাবে, অসাধু মাটি ব্যবসার সাথে এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত বলে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে। তারা কখনো প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে, আবার কখনো প্রভাব খাটিয়ে এই অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে অভিযোগ উঠেছে যে—
ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের কিছু রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও প্রভাবশালী মহল সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত।
তাদের প্রভাবের কারণে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে ভয় পাচ্ছে এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপও অনেক সময় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই—যে-ই হোক, যেই পর্যায়েরই হোক, এই অবৈধ মাটি ব্যবসার সাথে জড়িত সকল ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং সমাজ থেকে বর্জন করতে হবে।
এটি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং এলাকার স্বার্থে একটি সম্মিলিত প্রতিবাদ।
আসুন জেনে নিই— অবৈধ মাটি ব্যবসার কারণে যে ক্ষতিগুলো হয়:
১. কৃষি জমি নষ্ট হয়ে যায়-
উর্বর টপসয়েল (উপরের মাটি) কেটে নেওয়ার ফলে জমির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায়। ফলে ধান, সবজি বা অন্য ফসল ঠিকমতো জন্মায় না।
২. খাদ্য উৎপাদন কমে যায়-
জমি নষ্ট হওয়ায় এলাকায় খাদ্য সংকট তৈরি হতে পারে এবং কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৩. পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়-
মাটি কাটার ফলে গর্ত তৈরি হয়, পানি জমে থাকে, জমির প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৪. জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ে-
গর্ত ও অসমতল জমির কারণে বৃষ্টির পানি জমে যায়, যা জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে এবং বন্যার ঝুঁকি বাড়ায়।
৫. রাস্তা ও অবকাঠামোর ক্ষতি-
অতিরিক্ত মাটিবাহী ট্রাক চলাচলের কারণে গ্রামের রাস্তা, ব্রিজ ও কালভার্ট ভেঙে যায়।
৬. দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে-
গভীর গর্ত বা খোলা মাটি কাটার স্থান মানুষের জন্য বিপজ্জনক—বিশেষ করে শিশুদের জন্য।
৭. সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়-
অসাধু ব্যবসা নিয়ে বিরোধ, দখলদারিত্ব, মারামারি বা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে।
৮. ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পরিবর্তন হয়-
অতিরিক্ত মাটি কাটার কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে পানির সংকট তৈরি করতে পারে।
৯. সরকার রাজস্ব হারায়-
অবৈধভাবে মাটি বিক্রি হওয়ায় সরকার কোনো রাজস্ব পায় না—এটা দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।
অবৈধ মাটি ব্যবসা প্রতিরোধ বা সমাধানের জন্য করণীয়:
অবৈধ মাটি ব্যবসা বন্ধ করতে শুধু প্রতিবাদ নয়, প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, ঐক্য ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
১.সচেতনতা বৃদ্ধি করা-
এলাকার সবাইকে বোঝাতে হবে যে ফসলি জমি কেটে মাটি বিক্রি করলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ ক্ষতি হবে। মসজিদ, উঠান বৈঠক, স্কুল ও সামাজিক মাধ্যমে সবাইকে সচেতন করতে হবে।
২.ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়া-
এককভাবে নয়, পুরো গ্রাম/ওয়ার্ডের মানুষ একসাথে দাঁড়াতে হবে। যত বেশি মানুষ এক থাকবে, তত বেশি চাপ তৈরি হবে এবং অবৈধ কার্যক্রম কমে আসবে।
৩.প্রশাসনে লিখিত অভিযোগ দেওয়া-
ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন (UNO) এবং থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দিতে হবে।
মৌখিক অভিযোগের চেয়ে লিখিত অভিযোগ বেশি কার্যকর হয়।
৪.প্রমাণ সংগ্রহ করা-
অবৈধ মাটি কাটার বিষয়ে—ছবি, ভিডিও,সময় ও স্থান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য সব কিছু সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করতে হবে।
৫.সাংবাদিক ও মিডিয়াকে জানানো-
স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে যোগাযোগ করে বিষয়টি তুলে ধরতে হবে। মিডিয়ায় আসলে প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।
৬.মোবাইল কোর্ট ও অভিযান দাবি করা-
উপজেলা প্রশাসনের কাছে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য অনুরোধ করতে হবে। নিয়মিত অভিযান হলে অবৈধ কার্যক্রম কমে যায়।
৭.ট্রাক/ডাম্পার চলাচল নজরদারি করা-
কোথা থেকে মাটি যাচ্ছে, কোন রাস্তায় ট্রাক চলাচল করছে—এসব নজরদারি করতে হবে।
প্রয়োজনে ভিডিও প্রমাণ রাখতে হবে।
৮.স্থানীয় কমিটি গঠন করা-
গ্রাম বা ওয়ার্ড পর্যায়ে একটি কমিটি তৈরি করতে হবে যারা— নজরদারি করবে, প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ রাখবে ও এসব দ্রুত তথ্য জানাবে।
৯.শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা-
কোনো সংঘর্ষ বা বিশৃঙ্খলা না করে আইনের মধ্যে থেকে মানববন্ধন, আবেদন, স্বাক্ষর অভিযান করতে হবে।
১০.দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশ ও কৃষিজমি রক্ষা আন্দোলন-
শুধু একবার নয়, নিয়মিতভাবে সচেতনতা ও আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এই কাজ করার সাহস না পায়।
আমাদের লক্ষ্য—কোনো সংঘর্ষ নয়, বরং ফসলি জমি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা।
আসুন সবাই মিলে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই-
“জমি বাঁচাই, জীবন বাঁচাই “
লিখেছেন:
ইমাম হোসাইন কিরণ
সাধারণ সম্পাদক,
"আলহাজ্ব আবুল মোবারক কল্যান ফাউন্ডেশন"
চৌধুরীহাট, চরপার্বতী, কোম্পানীগঞ্জ, নোয়াখালী, বাংলাদেশ।