
প্রকাশিত, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১
আকাশ মার্মা মংসিং বান্দরবানঃ
চিম্বুকের নাইতং পাহাড়ে পাঁচতারকা হোটেলসহ পর্যটন স্থাপন প্রকল্প বাতিলে ১০ দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছে চিম্বুক পাহাড়ে বসবাসরত ম্রো জাতিসত্তার জনগণ।
আজ রবিবার (০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১) চিম্বুক হতে বান্দরবান শহরে লংমার্চ শেষে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে থেকে তারা এই আল্টিমেটাম দেন।
আজ সকালে চিম্বুক থেকে শত শত জনতা পায়ে হেঁটে বিভিন্ন ব্যানার, প্ল্যাকার্ড সহকারে বান্দরবান শহর অভিমুখে লংমার্চ শুরু করেন। এই কর্মসূচিতে ম্রো জাতিসত্তার মানুষ ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ অংশ নেন।
এ সময় তারা ‘আমার ভূমি আমার মা’, ’আমাদের ভূমি আমাদের অধিকার তোমাদেন নয়’, ’আমাদের জীবিকার উৎস অন্যায় হস্তক্ষেপ বন্ধ কর’, ’এই পাহাড় আমাদের জীবন’, ’মুনাফার জন্য পাহাড় বিকৃতি চলবে না, চলবে না’… ইত্যাদি শ্লোগান সম্বলিত প্ল্যাকার্ড বহন করেন।
লংমার্চে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ সংহতি জানায়। লংমার্চকারীদের লাইম পাড়া, শ্যারন পাড়া ও গেৎশিমানী পাড়ার বম জনগোষ্ঠী পানি ও শুকনো খাবার দিয়ে সহযোগিতা করে।
লংমার্চকারীদের পানি ও নাস্তা খাওয়ানোর জন্য পথে অপক্ষোরত একদল তরুণ লংমার্চ চলাকালে বান্দরবান-চিম্বুক সড়কের বৈথানি পাড়া ছয় মাইল এলাকায় প্রশাসনের লোকজন বাধা প্রদান করে। পরে লংমার্চকারীরা প্রশাসনের বাধা উপেক্ষা করে লংমার্চ নিয়ে বান্দরবান শহরের দিকে অগ্রসর হয়।
দীর্ঘ ২২ কিলোমিটার লংমার্চ করে এসে তারা বান্দরবান জেলা শহরের রাজার মাঠে অবস্থান নেন এবং সেখানে এক প্রতিবাদ সমাবেশ করেন।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, ম্রোদের ভূমি বেদখল করে চিম্বুকের নাইতং পাহাড়ে সিকদার গ্রুপ ও সেনাবাহিনীর কল্যাণ ট্রাস্ট কর্তৃক পাঁচতারকা হোটেল ও বিনোদন কেন্দ্র নির্মাণের ফলে আমাদের আনুমানিক ১০০০ একর ভোগদখলীয় ও চাষের ভূমি বেদখল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যার জন্য আমাদের ৬টি পাড়া সরাসরি উচ্ছেদের মুখে পড়বে এবং ১১৬টি পাড়ার আনুমানিক ১০ হাজার বাসিন্দার জুমচাষের ভূমি, শ্মশান ভূমিসহ পানির উৎস ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়াও আমাদের সংরক্ষিত পাড়াবন ও জীববৈচিত্র্য অচিরেই ধ্বংস হবে।
তারা বলেন, জেলা পরিষদ প্লান্টেশন প্রজেক্টের নামে ভূমি নিয়ে কীভাবে পাঁচতারকা হোটেল ও পর্যটন স্থাপনা নির্মাণের জন্য লিজ দিয়েছে তা আমাদের বোধগম্য নয়। কোন উপায়ে ম্রোদের জমি অন্যের কাছে লিজ দেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও জেলা পরিষদের সুস্পষ্ট বক্তব্য দাবি করেন বক্তারা।
তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যে মানুষগুলোর আজকে পায়ের সেন্ডেল নাই, যে মানুষগুলো জানেনা শিক্ষা কি জিনিস, যে মানুষগুলো ঠিকমত বেঁচে থাকার মৌলিক উপাদান থেকে শত শত বছর ধরে বঞ্চিত, সে মানুষগুলোর ভূমি কেড়ে নিয়ে, তাদেরকে উচ্ছেদ করে পর্যটন স্থাপন করলে কী লাভ হবে আপনাদের? আপনারা কেন এই মানুষগুলোর আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছেন না?
তারা দৃঢ়তার সাথে বলেন, যে অবলম্বনকে ঘিরে আমাদের বেঁচে থাকা সে অবলম্বনকে আমরা কিছুতেই ছাড়তে পারবো না। আজীবন এই মাটি আমরা আগলে রাখবো। চিম্বুকু পাহাড়বাসী তাদের ভূমির জন্য যে আন্দোলন করে যাচ্ছেন এ আন্দোলন ন্যায়ের, এ আন্দোলন ন্যয্যতার। এ আন্দোলন যাতে ব্যাহত করা না হয়।
বক্তারা পাঁচতারকা হোটেল ও পর্যটন স্থাপন প্রকল্প বাতিলে ১০ দিনের আল্টিমেটাম দিয়ে বলেন, এই সময়ের মধ্যে যদি ইতিবাচক কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়, যদি চিম্বুক পাহাড়বাসীর দাবি-দাওয়াকে পদধুলিত করার চেষ্টা করা হয় তাহলে এই মানুষগুলো থেমে থাকবে না। মনের ভেতর থেকে যে ক্ষোভ, বেদনা, যন্ত্রণা বহন করে তারা ন্যায্যতার কথা বলছেন সে বেদনা আপনারা প্রশমিত করে দিতে পারবেন না। কোন শক্তি তাদেরকে দমিয়ে রাখতে পারবে না।
তারা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, `আপনি যদি মনে করেন এই মানুষদের ভূমি নিয়ে আপনার যা ইচ্ছা তাই করবেন তাহলে আপনি ভুল করবেন। এই মানুষগুলো নিজেদের মাটি রক্ষা করার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত রয়েছে’।
বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আগামী ১০ দিনের মধ্যে পর্যটন প্রকল্প বাতিল সংক্রান্ত কোন উদ্যোগ যদি নেওয়া না হয় তাহলে এই মানুষগুলো আবার তাদের বেদনার কথা বলবে। তখন এই বেদনা প্রশমিত করার কোন শক্তি আপনাদের থাকবে না।
উল্লেখ্য, এর আগে গত বছর ৮ নভেম্বর ম্রো জনগণ কালাচারাল শোডাউনের মাধ্যমে প্রতিবাদ সমাবেশ করে পাঁচতারকা হোটেল নির্মাণ প্রকল্পটি বাতিলের দাবি করেছিলেন। একই দাবিতে ৭ অক্টোবর তারা প্রধানমন্ত্রীর বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন।
উক্ত প্রকল্পটি বাতিলের দাবি জানিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে ব্যাপক প্রতিবাদ-বিক্ষোভ সংগঠিত হয়। দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রকল্পটি বাতিলের দাবি জানিয়ে সরকারকে চিঠি দেয় ও সংবাদ মাধ্যমে বিবৃতি প্রদান করে।
কিন্তু ব্যাপক প্রতিবাদ সত্ত্বেও উক্ত প্রকল্পটি বাতিল করা হয়নি। বরং বর্তমানে নাইতং পাহাড়সহ আশে-পাশে বসবাসরত ম্রো জনগণকে নানাভাবে হয়রানি ও বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে।