
প্রকাশিত,০৩, জুলাই,২০২১
মো:রফিকুল ইসলাম,নড়াইলঃ
নড়াইল আধুনিক হাসপাতালে ৬ মাস ধরে বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে আছে ভেন্টিলেটরের যন্ত্রপাতি,শ্বাসকষ্টে ভুগছে অসহায় রোগী এমন কি শ্বাসকষ্টে মারাও গিয়েছেন রোগী।নড়াইল সদর আধুনিক হাসপাতালে শ্বাসকষ্টের রোগীদের জন্য এসেছে চারটি ভেন্টিলেটর।ছয় মাস আগে আসা এসব ভেন্টিলেটর এখন পর্যন্ত বাক্সবন্দি অবস্থায় আছে।অথচ ভেন্টিলেটরের অভাবে প্রায়ই নড়াইল আধুনিক সদর হাসপাতালে মারা যাচ্ছে রোগী।বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন,
ভেন্টিলেটরগুলো চালানো গেলে হয়তো অনেক জীবন বাঁচানো যেত।ভেন্টিলেটরগুলো কেন চালানো হচ্ছে না,এ ব্যাপারে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মো:আব্দুস শাকুর জানান, আইসিইউ শুরু না করলে ভেন্টিলেটর দরকার হচ্ছে না।এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুজন আইসিইউ বিশেষজ্ঞ জানান,আইসিইউ ছাড়াও ভেন্টিলেটর ব্যবহার করা যায়।বিশেষজ্ঞরা বলছেন,তীব্র শ্বাসকষ্টের রোগীদের অবস্থার অবনতি হলে,নিজে শ্বাস নেওয়ার শক্তি না থাকলে, জ্ঞান হারালে-এমন মরণাপন্ন রোগীদের শ্বাস-প্রশ্বাস চালিয়ে নিতে প্রয়োজন হয় ভেন্টিলেটর যন্ত্র।হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে,গত বছর ১৩ ডিসেম্বর এই হাসপাতালে স্থাপনের জন্য দুটি ভেন্টিলেটর যন্ত্র পাঠায় কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি)।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি দেওয়া হয় আরও দুটি ভেন্টিলেটর,তার দুটি রাখা হয়েছে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় অফিস কক্ষের বারান্দায়,অন্য দুটি একতলা ভবনের করোনা ওয়ার্ডের মধ্যে।হাসপাতালে সম্প্রতি চালু হয়েছে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থা।এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন নাছিমা আক্তার বলেন, এ হাসপাতালে কোভিড-১৯ রোগী ভর্তি হচ্ছে।তাই আমরা দুটি ভেন্টিলেটর সেখানে দিয়েছি।
এখন চালু করার দায়িত্ব তত্ত্বাবধায়কের।বিষয়টি জানতে বুধবার (৩০ জুন) দুপুরে হাসপাতালে তত্ত্বাবধায়কের অফিসে গেলে তিনি জানান,দুটি ভেন্টিলেটর করোনা ওয়ার্ডে চালু হয়েছে।অন্য দুটি চালু করতে সিএমএসডি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।তাঁর কক্ষে থেকে বের হয়েই দেখা হয় আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) আ,ফ,ম,মশিউর রহমানের সঙ্গে,তিনি বললেন,হাসপাতালে কোনো ভেন্টিলেটর আসেনি।
হাসপাতালের নিচ তলায় করোনা ওয়ার্ডে গিয়ে দায়িত্বরত নার্স (ইনচার্জ) বাসনা সাহার কাছে যখন জানতে চাইলাম,করোনার কোন ওয়ার্ডে ভেন্টিলেটর চালু আছে ? এ প্রশ্নে তাঁর মাথায় যেন বজ্রপাত পড়ল। ‘কি বলেন? দুটি ভেন্টিলেটর দেড়-দুই মাস আগে করোনা ওয়ার্ডে পাঠানো হয়েছে,তা আজ অবধি বাক্সবন্দি’ এ উত্তর দিলেন তিনি।পরে বলেন,আসেন দেখাই,এই যে ভেন্টিলেটর দুটি,তিনি এ প্রতিবেদককে সঙ্গে নিয়ে মূল ভবনের বাইরে পৃথক একতলা ভবনের করোনা ওয়ার্ডে গিয়ে কাগজের হার্ডবোর্ডের দুটি বড় প্যাকেট দেখালেন।সে দুটি রয়েছে ওই ওয়ার্ডের ভেতরে দক্ষিণ দেওয়াল ঘেষে।এ সময়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওই নার্স বলছিলেন,এটি চালানোর নিয়ম শেখাতে তিন দিন ঢাকা থেকে অনলাইনে প্রশিক্ষণ দিয়েছে আমাকে।সর্বশেষ ১৩ জুন।
আমি প্রশিক্ষণের সময়ে বলেছি কিছু বুঝলাম না। তখন সেখান থেকে বলা হয়েছে, তাঁরা এগুলো চালিয়ে দিয়ে যাবে।পরদিন বৃহস্পতিবার (১ জুলাই) সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ফোন দেই হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ককে। বললাম,আপনি বললেন,দুইটি ভেন্টিলেটর করোনা ওয়ার্ডে চালু করা হয়েছে,সেগুলো দেখলাম বাক্সবন্দি। তিনি তখন বলেন,প্যাকেট বন্দি নেই,ইন্সটল (চালু) করা হয়েছে।দুই মাস আগে ঢাকা থেকে এসে ইন্সটল করেছে।ইন্সটল করার পর হয়তো প্যাকেট করে রেখে দিতে পারে।অন্য দুটি ইন্সটল করতে সিএমএসডি কর্মকর্তাদের বলা হয়েছে।এরপর তিনি বলেন,আইসিইউ শুরু না করলে ভেন্টিলেটর দরকার হচ্ছে না।এর চিফ (প্রধান) হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ শাহীনুর রহমান,তাঁর সঙ্গে কথা বলেন।এ এইচ এম শাহীনুর রহমানকে (অ্যানেসথেসিয়া) ফোন দিলে তিনি বলেন,তত্ত্বাবধায়ক স্যার যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটাই আমার বক্তব্য,আমার নিজের কোনো বক্তব্য নেই।
এ বিষয়ে জানতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক (অ্যানেসথেসিয়া) ও সেখানে করোনা ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করেছেন এমন আরেকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়। তাঁরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,আইসিইউ ছাড়াও ভেন্টিলেটর ব্যবহার করা যায়।এটি ইচ্ছার ব্যাপার,এটি দিয়ে যাত্রা শুরু করে ধাপে ধাপে আইসিইউ করা যায়,সিএমএসডিতে অসংখ্য অটোমেটেড (আইসিইউ) শয্যা আছে,তা চাইলেই পাওয়া যাবে।এর আগে (বৃহস্পতিবার) সকাল সোয়া নয়টার দিকে মুঠোফোনে কথা হয় (আরএমও) আ,ফ,ম,মশিউর রহমানের সঙ্গে,হাসপাতালে ভেন্টিলেটর আসেনি বললেন,চারটি ভেন্টিলেটর হাসপাতালে পড়ে আছে-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,ভেন্টিলেটর যেটা ইন্সটলেশন হয়নি,সেটাতো আমরা কিছু করতে পারতেছি না।
ওইডার ভেতরে যে কি আছে এটাওতো খুলে আমরা দেখতে পারতেছি না,যতক্ষণ তাঁরা (সিএমএসডি) এসে না লাগিয়ে দেবে,আমরা তাঁদের লেখতেছি,এইগুলো বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। ভেন্টিলেটর দিলেই তো হবে না,তারা যে চালাবে তাঁর তো ট্রেনিং দিতে হবে,সেটাতো করে নি।
জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে উপ-পরিচালক (পিঅ্যান্ডসি) মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন বলেন,আমার ম্যাসেজ পেলেই ভেন্টিলেটর চালু করার ব্যবস্থা করে দেই।চালু হয়নি এটা ফোনে জানালেও আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে পারতাম।কয়দিন আগে বলার সঙ্গে সঙ্গে নওগাঁতে চালু করেছি।এ বিষয়ে নড়াইলের কয়েকজন সচেতন মানুষ বলেন, এই অবস্থা,অথচ তীব্র শ্বাসকষ্টের রোগীদের পাঠাতে হচ্ছে দূরের হাসপাতালে,সেখানে যেতে গিয়ে অনেকের পথেইে মৃত্যু হচ্ছে।
নড়াইল জেলা করোনা সংক্রমণের হারে দেশের মধ্যে অন্যতম,গত সপ্তাহে নড়াইল সদর হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে মৃত্যু হয়েছে চারজনের।