

প্রকাশিত
মোঃ শিহাব উদ্দিন | গোপালগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি।
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নিষিদ্ধ গাইড বই কিনতে চাপ দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। এ অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ করায় সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী অভিভাবক নেতা মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েল-এর বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেছেন শিক্ষকদের একটি অংশ। ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে যেমন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও জন্ম দিয়েছে তীব্র বিতর্কের।
আজ সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে কোটালীপাড়া উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কোটালীপাড়ার ৬৮ নং তারাশী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-এর অভিভাবক সমিতির সভাপতি ও দৈনিক আমার দেশ-এর কোটালীপাড়া প্রতিনিধি মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েল রোববার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে নিষিদ্ধ গাইড বইয়ের একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকে উপস্থিত রেখে শিক্ষার্থীদের গাইড বই কিনতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। মুহূর্তেই বিষয়টি জনসাধারণের নজরে আসে এবং সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় তীব্র আলোচনা-সমালোচনা।
এর পরদিন সোমবার সকালে একই অভিযোগে তিনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও উপজেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, লেকচার প্রকাশনী-র এক প্রতিনিধিকে সঙ্গে নিয়ে কয়েকজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে গিয়ে শিক্ষার্থীদের গাইড বই কেনার জন্য প্ররোচিত করেন এবং পরবর্তীতে অভিভাবকদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। এতে অভিভাবক মহলে চরম অসন্তোষ ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
সাংবাদিক জুয়েলের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষুব্ধ হয়ে ৬৮ নং তারাশী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অশোক কুমার অধিকারী ও সহকারী শিক্ষক রসময় রত্ন-এর নেতৃত্বে উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান ও সহকারী শিক্ষকরা শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে মানববন্ধন করেন। মানববন্ধনে বক্তারা দাবি করেন, সাংবাদিক মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েল বিভিন্নভাবে শিক্ষকদের হয়রানি করছেন এবং তাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছেন।
এ বিষয়ে সাংবাদিক মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েল সাংবাদিকদের জানান।
“আমি বিদ্যালয়ের অভিভাবক-শিক্ষক সমিতির (পিটিএ) সভাপতি হিসেবে অভিভাবকদের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতেই বিষয়টি প্রকাশ করেছি। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা, এতে কোনো প্রশ্ন নেই। তবে যদি কোথাও অনিয়ম হয়ে থাকে, তা অবশ্যই তদন্ত হওয়া উচিত। অনিয়মের প্রতিবাদ করায় আমার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হয়েছে—যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।”
তিনি আরও জানান, সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থেই তিনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
এদিকে শিক্ষকদের মানববন্ধনের খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
ফিরোজ দাড়িয়া নামে একজন মন্তব্য করেন, “এটা সাংবাদিক জুয়েলের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট চক্রান্ত। হয়রানির কোনো নির্দিষ্ট কারণ তারা দেখাতে পারেনি।”
অন্যদিকে কাজী মোস্তাফিজ লেখেন, “মনিরুজ্জামান জুয়েল একজন স্পষ্টভাষী, সৎ ও সাহসী সাংবাদিক। তিনি শিক্ষকদের অমঙ্গল চান—এ কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়।”
এ বিষয়ে জানতে ৬৮ নং তারাশী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অশোক কুমার অধিকারীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাগুফতা হক কালবেলাকে জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের গাইড বই কিনতে প্ররোচনার বিষয়ে সাংবাদিক জুয়েলের একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সাংবাদিক জুয়েলের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের মানববন্ধনের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, মানববন্ধনের বিষয়টি তিনি শুনেছেন, তবে এ সংক্রান্ত কোনো লিখিত অভিযোগ এখনো তার দপ্তরে জমা পড়েনি।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে গাইডনির্ভর শিক্ষা শিশুদের সৃজনশীলতা ও মৌলিক শেখার সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে, যা সরকারের শিক্ষানীতিরও পরিপন্থী। তাই অভিযোগের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছেন অভিভাবক ও সচেতন মহল। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষায় শিক্ষা মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।


















আপনার মতামত লিখুন :