
প্রকাশিত
সঞ্জিব দাস, গলাচিপা, পটুয়াখালী, প্রতিনিধি
শীত-বর্ষা-বসন্ত বারো মাসই খাল সাঁতরে স্কুলে যেতে হয় চরকারফারমা সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের।
আর এতে করে স্কুল বিমুখ হয়ে পড়েছে ওই এলাকার প্রাথমিকের শিশুরা। ওই স্কুলের অর্ধশত শিশু শিক্ষার্থীর জন্য নৌযান বা বিকল্প কোন ব্যবস্থা না থাকায় খাল সাঁতরে ভিজে স্কুলে আসার আগ্রহ হারাচ্ছে শিশুরা।
সরেজমিনে মঙ্গলবার গলাচিপা উপজেলার সদর ইউনিয়নের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন চরকারফারমা স্কুলে এসব চিত্র দেখা যায়।
সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের একটি অংশ চরকারফারমা। আগুনমুখার মোহনায় বিভক্ত সদর ইউনিয়নের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে গড়ে উঠেছে এ দ্বীপটি। দ্বীপটির দক্ষিণে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট, তার পরেই বঙ্গোপসাগর। পশ্চিমে রামনাবাদ, পূর্বদিকে তেঁতুলিয়া নদী আর উত্তরে উত্তাল আগুনমুখার মোহনা। দূর থেকে দ্বীপটি দর্শনীয় হলেও দ্বীপের যাতায়েতের রাস্তাঘাট না থাকায় ভোগান্তি হচ্ছে বসবাসরত সাধারণ মানুষসহ শিক্ষার্থীদের। আর এ ভোগান্তি চরমে পৌঁছে বর্ষা মৌসুমে। দ্বীপটিতে কোন বেড়িবাঁধ না থাকায় বছরের সব সময়ই স্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে স্কুল মাঠসহ রাস্তাঘাট সব ডুবে থাকে।
এখানে মোট ৮০টি জেলে ও কৃষক পরিবার বসবাস করেন। এসব পরিবারের শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে গত ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত করা হয় সরকারি প্রাইমারি স্কুল। এ স্কুলে ৫১ জন শিক্ষার্থী এর মধ্যে ছাত্র ২৬ জন এবং ২৫ জন ছাত্রীর জন্য ৩ জন শিক্ষক রয়েছে।
দুর্গম চরকারফারমা যেতে হলে গলাচিপা সদর থেকে ৮ কিলোমিটর দক্ষিণে সদর ইউনিয়নের বোয়ালিয়া স্লুইসগেটে যেতে হয়। এর পর সেখান থেকে প্রায় আধাকিলোমিটার পায়ে হেঁটে আগুনমুখার তীরে খেয়াঘট। কারফারমা দ্বীপের জন্য একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম এই একটি মাত্র খেয়া। আর শিক্ষকসহ সাধারণ মানুষকে এ খেয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। খেয়ায় উত্তাল আগুনমুখা পার হয়ে কারফারমা ঘাটে নেমে অন্তত পাঁচটি খাল সাঁতরে চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে হয়। একদিকে যোগাযোগের জন্য নেই কোন রাস্তা অপরদিকে দ্বীপটির ভিতরে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা খালগুলো স্বাভাবিক চলাচলে মারাত্মক বিঘœ সৃষ্টি করে। এসব প্রতিকূলতাই যেন নিয়তি ওই স্কুলের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের।
চরকারফারমা স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র মো. জহিরুল ইসলাম জানায়, আমার বাড়ি চর কারফারমার শেষ সীমানা দক্ষিণ দিকে ফরেস্টের পাশে। আমাগো বাড়ি দিয়া স্কুলে আইতে পাঁচটা খাল সাঁতরে আসতে হয়। প্রতিদিনই আমার সাথে ৭-৮ জন খালে সাঁতার কেটে স্কুলে আসি। বেশি বৃষ্টি থাকলে বই খাতা ভিজে যায়।
একই স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইয়াসিন জানায়, বৃষ্টি ও খালের পানিতে শরীর সারাদিনই ভিজে থাকে। এতে শরীর খারাপ করে। বেশি খারাপ লাগলে কয়েকদিন বাড়িতেই থাকি। আমাগো একটা নৌকা আছে। কিন্তু ওই নৌকা দিয়া নদীতে মাছ ধরেতে যায়, তাই খাল সাঁতরেই স্কুলে যেতে হয়।
চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি শাহিদা বেগম বলেন, ‘এ চরে ৮০টি পরিবার বসবাস করে। আমি জায়গা দিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠা করি। কিন্তু রাস্তা করার মতো আমার সামর্থ নেই। স্কুলে যাতায়েতের জন্য হলেও কিছু রাস্তাঘাট করা দরকার।’
এ বিষয়ে গলাচিপা সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর হোসেন টুটু বলেন, ‘স্কুলে যাওয়ার রাস্তা নেই- এ কথাটি সত্য। আপাতত কোন বরাদ্দ নেই। সামনে বরাদ্দ পেলে অবশ্যই রাস্তার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে।’
এ প্রসঙ্গে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. গোলাম সগীর বলেন, ‘বিষয়টি দুখজনক।
রাস্তা না থাকার কারণে স্কুলের শিক্ষার্থী কমে গেছে। স্কুলের রাস্তা না থাকার বিষয়টি ইউএনও ও প্রতিমন্ত্রী মহোদয়কে অবহিত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন, সামনের বরাদ্ধ দিয়ে স্কুলে যাওয়ার উপযোগী একটি রাস্তা করে দেবো।