
প্রকাশিত,০২, জুন,২০২৩
জাবি প্রতিনিধি ঃ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা) পদটি প্রায় ৮ মাস শুণ্য থাকলেও হঠাৎ চলছে প্রো-ভিসি নিয়োগের গুঞ্জন।
তবে প্রো-ভিসি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল্লাহেল কাফির নাম প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যাওয়ার গুঞ্জনে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অংশীজনরা। কারণ হিসেবে তারা বলছেন অধ্যাপক কাফির বিরুদ্ধে থাকা যৌন নিপীড়নের একাধিক অভিযোগ ও তার শিক্ষাগত যোগ্যতা।
মূলধারার বিভিন্ন গণমাধ্যম ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যায়, অধ্যাপক কাফির বিরুদ্ধে ছাত্রাবস্থা থেকে শিক্ষক থাকাকালীন সময় পর্যন্ত যৌন নিপীড়নের ২টি, ১টি ফৌজদারী মামলার চার্জশিটে অভিযুক্ত ছিলেন।
যৌন নিপীড়নের একটি অভিযোগ ১৯৯৬ সালে এমফিলের ছাত্র থাকাবস্থায় অপরটি শিক্ষকতাকালীন। প্রথম অভিযোগ পর্যালোচনা করে দেখা যায় ১৯৯৬ সালে এম.ফিল এর ছাত্র থাকাবস্থায় সাভারস্থ একজন প্রকৌশলীর স্ত্রীর সাথে যৌন হয়রানিমূলক আচরণ করেন এবং সেখানে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একজন শিক্ষকের নাম ব্যবহার করেন। এ বিষয়ে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রযাত অধ্যাপক আফসার আহমেদকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। তিনি প্রয়াত হওয়ায় এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া যায়নি।
দ্বিতীয় অভিযোগটি অধ্যাপক কাফির বিরুদ্ধে একই বিভাগের আরেক শিক্ষিকার করা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ। এ অভিযোগে অধ্যাপক কাফিকে পদাবনতি ও বিভাগীয় সভাপতির দায়িত্ব থেকে অপসারণ করার শাস্তি দেওয়া হয়। এ অভিযোগের তদন্ত ও বিচারে জটিলতা সৃষ্টি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন উপদেষ্টা ও তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেলের পরামর্শ ন্যায় সিন্ডিকেট।
২০১০ সালের ৯ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন রেজিস্ট্রার আবু বক্কর সিদ্দিক স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (তৎকালীন সভাপতি) ড. মোঃ আবদুল্লাহ হেল কাফীর বিরুদ্ধে একই বিভাগের একজন শিক্ষিকা কর্তৃক ২০১০ সালের ১ এপ্রিল এবং ১৫ এপ্রিল তারিখে আনীত যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্তের জন্য ১৪ মে ২০০৯ তারিখে প্রদত্ত মহামান্য হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী গঠিত Complaint Committee-র তদন্ত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৫ আগস্ট ২০১০ তারিখে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের বিশেষ সভার ড. মো. আবদুল্লাহ হেল কাকীকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী দক্ষতা ও শৃঙ্খলা অধ্যাদেশ-এর ৩ (জ) ধারা অনুযায়ী অসদাচরণের (misconduct) অভিযোগে অভিযুক্ত করে ২টি শাস্তি প্রদান করা হয়।
এর মধ্যে রয়েছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারী দক্ষতা ও শৃঙ্খলা অধ্যাদেশ-এর ৪(১)(ঙ) উপাধারা অনুযায়ী সহযোগী অধ্যাপক পদ হতে সহকারী অধ্যাপক পদে পদাবনতি এবং বিভাগীয় সভাপতির দায়িত্ব থেকে অপসারণ।
এছাড়াও অধ্যাপক কাফির বিরুদ্ধে রয়েছে ডাকাতির অভিযোগে নিজ গ্রামের মানুষের মামলা। সেসময এলাকাবাসীর পক্ষে মামলাটি করেন আয়নাল হক। মামলা নম্বর ছিল ১৭। মামলায় তাকে প্রধান আসামি করে ৬ মার্চ ২০০০ তারিখে চার্জশিট দেয়া হয়।
এসব অভিযোগ নিয়ে অধ্যাপক কাফি বলেন, প্রথম অভিযোগটি সর্বৈব মিথ্যা ও বানোয়াট। দ্বিতীয় অভিযোগের (শিক্ষিকার করা অভিযোগ) কোনো ভিত্তি পায়নি ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি। তৃতীয় অভিযোগটি মিথ্যা হওয়ায় বাদী মামলাটি প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।
তবে একই বিভাগের নারী শিক্ষিকার করা অভিযোগের প্রেক্ষিতে অধ্যাপক কাফি তার বক্তব্যের সমর্থনে কোনো অফিস আদেশ বা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দেখাতে পারেন নি। তিনি দুয়েকটি পত্রিকার ক্লিপ দেখিয়েছেন যেখানেও কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এর একটি ভূইফোড় অনলাইনে অধ্যাপক ফারজানা ইসলামকে উদ্বৃত্ত করে অধ্যাপক কাফিকে নির্দোষ দাবি করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে ওই তদন্ত কমিটির প্রধান ও সাবেক তথ্য কমিশনার অধ্যাপক খুরশিদা বেগম বলেন, আমরা তথ্য প্রমাণ নিয়েই কাজ করেছিলাম। আর প্রমাণ না থাকলে কিসের ভিত্তিতে সুপারিশ করেছে কমিটি? আর অভিযোগ মিথ্যা হলে অভিযোগকারী অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট নিয়ে উনি কেন চ্যালেঞ্জ করেন নি? আর যতটুকু মনে পড়ে আমি কম শাস্তির পক্ষে ছিলাম বরং অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম তাকে চাকুরী থেকে বরখাস্তের পক্ষে ছিলেন। হাইকোর্টের গাইডলাইন মেনেই তদন্ত কমিটি কাজ করেছিল।
কাফির নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন?
অধ্যাপক কাফির শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ ও তার একাডেমিক যোগ্যতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। ১৯৯৯ সালের ৬ অক্টোবর তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আলাউদ্দিন আহমেদের বিশেষ ক্ষমতাবলে অ্যাডহক ভিত্তিতে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে ২বার নিয়োগের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হন তিনি। পরে অনির্দিষ্টকালের ছুটি চলাকালীন নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়াও সিন্ডিকেটে তার নিয়োগের ব্যপারটি সিলেকশন কমিটিতে পুনর্বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়। তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের হলেও তার সিলেকশন বোর্ডে ছিলেন ইতিহাস বিভাগের দুজন অধ্যাপক। অভিযোগ রয়েছে তাকে নিয়োগ দিতেই এ বোর্ড করা হয়েছিল। বিভাগের ফলাফলে তার অবস্থান ছিল ২১তম। শিক্ষা জীবনের সব স্তরেই তার রযেছে দ্বিতীয় বিভাগ।
এসব নিয়ে অধ্যাপক কাফি বলেন, এডহক হিসেবে নিয়োগ পাওয়াটা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম বহির্ভূত নয়। আমার নিয়োগ বোর্ডে ইতিহাস বিভাগের কেউ ছিল না। নিয়োগ বোর্ডে ওই সময়কার প্রো ভিসি তাজুল স্যার ছিল। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি আতাউর রহমান স্যার ছিল। তিনি বলেন, আমি পরবর্তীতেও কখনও নিয়োগের অযোগ্য বিবোচিত হই নি। এসএসসি পরীক্ষায় আমার ৬৪৩ নম্বর ছিল। স্নাতকে আমার সেকেন্ড ডিভিশন ছিল। সর্বমোট ৫৮ শতাংশ নম্বর ছিল। বিভাগের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলাম।
তিনি আরও বলেন, আমি ১৪ তম বিসিএস ক্যাডার ছিলাম। আমার বাংলাদেশ-সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্ক নিয়ে এম ফিল ডিগ্রীতে ২ টি আর্টিকেল আছে। পরে পিএইচডি করেছি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে। আমি আলাউদ্দীন স্যারের আমলে যোগ্যতার পরিচয় দিয়েই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছি। কোনোরকম বাটপারি করে টিচার হইনি। নিজের যোগ্যতা দিয়েই হয়েছি।