
প্রকাশিত,২০,মে,২০২১
রাজীব সরকার, নেত্রকোণা প্রতিনিধিঃ
অর্থ আর শিক্ষা সংকটে গ্রামে ভূয়া চিকিৎসকের খপ্পরে পড়েছিলেন চার সন্তানের জননী হতদরিদ্র শেফালি আক্তার। বুকের বামপাশে সামান্য ব্যথায় গ্রামের ভূয়া চিকিৎসক মানিক মিয়া’র ডাকে সাড়া দিয়ে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন। আর অজান্তে তখনই মৃত্যুকে ডেকে আনলেন তিনি।
বুকে ব্যথার কথা শুনেই মানিক জানিয়ে দিলেন শেফালি’র স্তন ক্যান্সার। রোগমুক্তি বা জীবন বাঁচাতে অতিসত্বর প্রয়োজন বড় অপারেশন। সেজন্য ওষুধ ছাড়াই দরকার হবে মিনিমাম পঞ্চাশ হাজার টাকা। অবশ্য শেফালি দরিদ্র হওয়ায় মানবিকতার মিথ্যে গল্প বুনে সেই খরচ বিশ হাজারে নামিয়ে আনেন মানিক। অপরদিকে অপারেশন করে জীবন বাঁচাতে ভিক্ষা, ধারদেনা আর সুদ করে টাকা সংগ্রহ করেন শেফালি ও তার মা। গ্রামের একরকম খুপরি দোকানঘর তথা কথিত অপারেশন থিয়েটার ; মানিকের কাছে টাকা নিয়ে হাজির হন।
নেত্রকোণার খালিয়াজুরী উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের পাঁচহাট গ্রামে ঘটে ভয়াবহ এ ঘটনা। গ্রামের পাঁচহাট বাজারেই ওষুধ বিক্রির দোকানের (ইকবাল হোমিও ফার্মেসি) ভিতরে হয় শেফালি’র স্তন ক্যান্সার নামের কথিত অপারেশন! ভূয়া চিকিৎসক মানিক দুই টাকার একটি ব্লেড কিনে হোমিও ফার্মেসির ভিতরে ইকবাল’র সহযোগিতায় শেফালি’র ওপর অপারেশন নামে চালায় কসাইগিরি। কেটে ফেলে শেফালির বামপাশের স্তন...!
২০১৯ সালের ০৭ মে, রোববার দিনের ভয়াবহ এ ঘটনার পর ধীরে ধীরে শেফালির শারীরিক অবস্থা দ্রুত পরিবর্তন শুরু হয়। কিছুদিন যেতে না যেতেই কাটা স্তনের অংশে ধরে যায় পচন। শেফালি’র অবস্থা এক মিনিট যায় তো হতে থাকে আরো বেশি ভয়াবহ। রোজগারহীন সংসারে বিনাচিকিৎসায় ধুঁকতে থাকে শেফালি।
বিষয়টি স্থানীয় সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানতে পেরে ওই গ্রামে সরেজমিনে হাজির হন নেত্রকোণা জেলার সাংবাদিক কামাল হোসাইন ও সৌমিন খেলন। এ নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন করা হলে স্থানীয় ও জেলা প্রশাসন শেফালির পাশে দাঁড়ান। অপরদিকে জেলা পুুলিশ সুপার মো. আকবর আলী মুনসী’র নির্দেশে ভূয়া ডাক্তার মানিককে করা হয় আটক। এবং পরে মামলায় তাকে দেখানো হয় গ্রেফতার।
এরই সাথে শেফালিকে বাঁচাতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের উদ্যোগে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতাল। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর শেফালি কিছুটা সুস্থ হয় তথাপি তার ক্ষতস্থান শুকিয়ে আসতে থাকে। পরে সে হাসপাতাল থেকে খালিয়াজুরী বাড়িতে আসেন।
বাড়িতে যাবার আগেই নেত্রকোণা জেলা প্রশাসন থেকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয়। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই স্তনের ক্ষত স্থানে আবারো পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়! চলতে থাকে নতুন করে চিকিৎসা। করোনা শুরু থেকে ঘটে চিকিৎসায় ব্যঘাত। অবশেষে ধুঁকতে ধুঁকতে মঙ্গলবার (১৮ মে) দিনগত রাতে নিজ গ্রামের বাড়ি খালিয়াজুরীর পাঁচহাট গ্রামে মারা যান শেফালি। তার মৃত্যুর খবরে রাতেই ছুটে যায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ.এইচ.এম আরিফুল ইসলাম। এবং দিনে মৃতের নামাজে জানাজায় করেন অংশগ্রহণ।
এসময় গাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান উপজেলা আ’লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. আতাউর রহমান, স্থানীয় প্রেসক্লাব সভাপতি সাংবাদিক মহসিন ও সাবেক সভাপতি শফিকসহ শেফালি’র প্রতিবেশীরা এতে অংশ নেন।
খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ.এইচ.এম আরিফুল ইসলাম জানান, বিষয়টি জানার পর থেকেই উপজেলা প্রশাসন ও ব্যক্তি উদ্যোগে শেফালি’র পাশে ছিলেনগন তিনি।
গত এই দু-তিন বছরে শেফালি’র পিছনে খাবারদাবার ও আনুষঙ্গিক খরচে ব্যয় করা হয়েছে কয়েক লক্ষাধিক টাকা। এছাড়াও তার থাকার ভালো কোনো ঘর ছিলো না। সেক্ষেত্রে তাকে নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে আধাপাকা একটি ঘর। নামাজে জানাজায় এসেও এবার শেফালি’র মেয়ে তৃষাকে দেয়া হয়েছে আর্থিক সহায়তার নগদ কিছু অর্থ।
খালিয়াজুরী থানার তখনকার অফিসার ইন-চার্জ এ.টি.এম মাহমুদুল হক জানান, ভূয়া চিকিৎসায় শেফালি’র স্তন কাটার ঘটনায় নামধারী চিকিৎসক মানিক মিয়াকে সেই বছরেই মঙ্গলবার (১০ সেপ্টেম্বর) করা হয়েছিলো গ্রেফতার। পরে তাকে আদালতে পাঠানো হয়। মানিক পার্শ্ববর্তী মদন উপজেলার মাঘান ইউনিয়নের কাতলা গ্রামের আমির উদ্দিন তালুকদারের ছেলে।
রাজীব সরকার
নেত্রকোণা প্রতিনিধি
তারিখ- ২০.০৫.২১