
প্রকাশিত,১৮, মার্চ,২০২২
রাকিবুল হাসান আহাদ, বিশেষ প্রতিনিধিঃ
পৃথিবীর আলো বাতাস কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই নিখোঁজ হতে হলো দেড় বছরের শিশু সাদমান সাকিকে। চার বছর তিনমাস ধরে নিখোঁজ সে। জানা নেই তার কি অপরাধ? কোন অপরাধে তাকে বাবা মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত হতে হলো। তবে এখনও তার বাবা মা বিশ্বাস করেন তাদের সন্তান একদিন তাদের কোলে ফিরে আসবে।
১৬ মার্চ বুধবার সাদমান সাকির ৫ বছর পূর্ণ হয়ে ৬ষ্ঠ বর্ষে পদার্পন হতে চলল। গত চার বছর আগের এইদিনে সে তার বাবা-মায়ের সাথে জন্মদিন পালন করেছিল। কিন্তু আজ সে তার বাবা-মার কাছে নেই। আর এই অবুঝ শিশু সাদমান সাকির খোঁজে তার বাবা-মা পাগল প্রায়। প্রায় প্রতিনিয়তই নগরীর অলিগলিতে তার তাদের সন্তানের খোঁজ করে থাকেন। কিন্তু কোথাও যেন দেখা মিলছে না তার।
আর এই সন্তানের শোকে তার বাবা মা নিজেদেরকে কোনভাবেই শান্ত রাখতে পারছেন না। সাকির খোঁজে এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরে বেড়ালেও তার কোন খোঁজ মিলছে না।
প্রথমে পুলিশের ব্যর্থতায় মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্তাধীন যায়। কিন্তু সেখানে সন্তোষজনক উত্তর মিলেনি। এরপর মামলাটি সিআইডির তদন্তাধীন যায়। এখানেও সাদমান সাকির বাবা সৈয়দ ওমর খালেদ এপন সন্তুষ্ট হতে পারেনি। পরবর্তীতে ২০২০ সালের ১ সেপ্টেম্বর ফাইনাল রিপোর্টের শুনানীতে সিআইডির তদন্তের প্রতিবেদন রিপোর্টে নারাজি প্রকাশ করেন বাদী পক্ষের আইনজীবী ও আদালতে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট জাসমীন আহম্মেদ।
সেই সাথে নারায়ণগঞ্জে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুন্যাল আদালতের বিচারক মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন মামলার তদন্তভার সিআইডি থেকে বদলি করে র্যাবের কাছে হস্তান্তরের আদেশ দেন। বর্তমানে সেই মামলাটি র্যাবের তদন্তাধীন রয়েছে।
সাদমান সাকির বাবা সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সৈয়দ ওমর খালেদ এপন বলেন, র্যাব মামলাটির দায়িত্ব পেয়েছে প্রায় দেড় বছর হয়ে গেলো কিন্তু কোন অগ্রগতি নেই। কিন্তু আমরা এখনো বিশ্বাস রাখতে চাই সকল বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে রাজনৈতিক চাপমুক্ত হয়ে তারা যদি সঠিক ভাবে তদন্ত করে তাহলে অল্প দিনের মধ্যে সাদমান সাকিকে উদ্ধার করা সম্ভব। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধকালীন কমান্ডারের নাতীকে দিনদুপুর বেলা ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পিত ভাবে অপহরণ করা হলো। প্রায় ৪ বছর ৩ মাস হয়ে গেলো এখনো উদ্ধার করা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, আমার বাবা নিজের জীবন বাজি রেখে এই দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন সম্মুখ যুদ্ধ করে এই দেশকে সাধীন করেছেন একটি সাধীন দেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার নাতি কে অপহরণ হতে হয় ভাবতে খুব কষ্ট লাগে। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকাকালীন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তানকে অপহরণ করা হয় ৪ বছরেও উদ্ধার করা হয়না এটাকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বলতে পারিনা।
এর আগে সৈয়দ ওমর খালেদ এপনের বরাত দিয়ে পিবিআই এর তদন্তকারী কর্মকর্তার ভাষ্য ছিল, এ ঘটনাটি কাছের লোকজনই ঘটিয়েছে। সেই সূত্র ধরে কয়েকজনকে অভিযুক্ত করে জেলা পুলিশ সুপার সহ বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন জানিয়েছিলেন এপন। কিন্তু সেখানেও সাড়া মিলেনি। মানবন্ধন অনশন সহ সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
সাদমান সাকির বাবা সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সৈয়দ ওমর খালেদ এপন বলেন, আমাদের অনেক আদরের একমাত্র সন্তান সাদমান সাকি। আমি মানুষের সেবার জন্য দীর্ঘদিন ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছি। আমার জানামতে আমি কারো ক্ষতি করেনি। তারপরেও যদি ক্ষতি করে থাকি, তাহলে সে শাস্তি আমাকে দেয়া হোক।
কিন্তু আমার এই অবুঝ শিশুর কি অপরাধ। শিশুটির জন্য তার মা সারাক্ষণ কান্নাকাটি করে থাকে। ঠিকমতো খাওয়া ধাওয়া করে না। সংসারের কোন কাজে তার মনযোগ নেই। আমি কোন কিছু করতে পারছি না। সবসময় আমার সন্তানের কন্ঠ কানে বাজে। জানি না আমার ছেলেটি কি অবস্থায় কোথায় আছে। তবে আমি বিশ্বাস করি একদিন আমার ছেলের খোঁজ অবশ্যই পাবো। আমার ছেলেকে কাছের মানুষই অপহরণ করেছে এবং এটি একটি পরিকল্পিত ঘটনা। আমি কাউন্সিলর নির্বাচন করেছিলাম। আর এ কারণেই আমাকে থামিয়ে রাখার জন্য কাউন্সিলর নাজমুল আলম সজল ও তার অনুসারীদের দিয়ে আমার ছেলেকে অপহরণ করিয়েছে। আমি আমার ছেলের সন্ধান চাই।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ১ ডিসেম্বর শুক্রবার দুপুর দেড়টায় ঘরের বাইরে খেলার সময় দেওভোগ কাঠের দোতলা বড় জামে মসজিদ এলাকা থেকে শিশু সাদমান সাকি নিখোঁজ হয়। সাদমান সাকির খোঁজে নগরীতে সর্বস্তরের জনগণের ব্যাপারে মানববন্ধন এবং নিখোঁজের ১৩ দিন পর নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় সাদমান সাকির বাবা সৈয়দ ওমর খালেদ এপন একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেছিলেন।